Monday, 2 January 2017

সুন্দরবনের গল্প (মোবাইল ভার্শন): অর্জুন সর্দার

অর্জুন সর্দার

শিশির  বিশ্বাস
রোদে পোড়া হালকা-পাতলা ছেলেটার সঙ্গে প্রথম দেখা সাতজেলিয়ার দত্তর ঘাটে। গোড়ায় শুরুটা করেছিল নেপালদা। সুযোগ পেলেই কাউকে নিয়ে একটু মশকরা করা ওর বেজায় পছন্দতার উপর মেজাজ মোটেই ভাল নেই তখন। সুন্দরবনে বেড়াতে এসে নৌকোয় ঘোরা হয়ে গেছে দিন দুয়েক। অথচ যে জন্য আসা তার কিছুই হয়নি। নেপালদার মেজাজ তাই তখন একটু চড়েই রয়েছে।  আসলে পুজোর পরে সেবার সুন্দরবনে বেড়াবার এই আয়োজনের উদ্যোক্তা গৌর হলেও নেপালদার আগ্রহটাও কম ছিল নাকারণও ছিল। ওর পরিচিত কে নাকি সুন্দরবনে বেড়াতে এসে একসাথে জোড়া বাঘ দেখে গেছে। সেই থেকে ব্যাপারটা ঢুকে রয়েছে মাথায়।
কাজের মানুষ গৌর কিন্তু অনেক খোঁজ-খবর করেই আয়োজন করেছিল। সুন্দরবন ঘোরবার সেরা সময় পুজোর পরে এই অক্টোবর। চমৎকার শান্ত নদী। রাতে ভয়ানক হিম বা ভোরের কুয়াশা থাকে না। রাতে ফুটফুটে জ্যোৎস্নার আলোয় ম-ম করে চারপাশ। এসবের খানিকটা আঁচ পেয়ে গিয়েছিলাম সেই প্রথম দিনই। গোসাবা হয়ে সরু এক খাল দুর্গাদোয়ানি ধরে ভটভটি গোমদি নদীতে এসে পড়তেই দেখি সামনে বিস্তীর্ণ নীল জলরাশি। একদিন বাদেই কোজাগরী পূর্ণিমা, বিকেলের মরা আলোয় দিগন্তের কাছে পুব আকাশে থালার মতো বড়ো একটা চাঁদ। ওপারে সেই আকাঙিক্ষত  সুন্দরবনের জঙ্গল। গরান, গর্জন, বাইন প্রভৃতি রকমারি ম্যানগ্রোভের ঘন অরণ্য। শুধু সবুজ আর সবুজ। খানিক বাদে ভটভটি যখন ওপারে জঙ্গলের ধার ঘেঁষে চলতে শুরু করল, দেখি ছোট এক হরিণের পাল। শিংওয়ালা বড়ো একটা হরিণ দিব্যি দু”পায়ে ভর দিয়ে গাছ থেকে পাতা ছিঁড়ে খাচ্ছে। তারপর দু”দিন পার হয়ে গেছে, ঘোরা হয়ে গেছে সুন্দরবনের অনেক গলিঘুঁজি। সরু খাল, নদী, কিন্তু আসল ব্যাপারটা সিদ্ধ হয়নি। অর্থাৎ বাঘের দেখা। সুতরাং নেপালদার মেজাজও আর ভাল হয়নি। এই সময়ই দেখা সেই ছেলেটার সঙ্গে। আমাদের ভটভটি তখন একটু বেলার দিকে এসে ভিড়েছে দত্তর ঘাটে। সামনে বিশাল দত্তর গাঙ। তিনটে নদী এসে মিলেছে এখানে। সেদিকে তাকালে যতদূর চোখ যায় শুধু জল আর জল। বড়ো-বড়ো ঢেউ আছড়ে এসে পড়ছে গরাণ কাঠের নড়বড়ে জেটির গায়ে। সামান্য হাটবাজার সারতে উপরে গ্রামের দিকে গেছে কয়েকজন। বাকিদের গুলতানি চলছে নৌকোয়। ঘাটের একধারে বসা ছেলেটার দিকে নজর পড়ল সবার। বয়স বড়োজোর তের একমাথা উসকোখুসকো চুলে তেল পড়েনি অনেক দিন। রোগা খড়িওঠা শরীর। খানিক আগে কাজের তাগিদে নদীর কাদায় নামতে হয়েছিল হয়তো। হাঁটু পর্যন্ত সেই পুরু কাদা শুকিয়ে সাদা হয়ে রয়েছে। একটু মজা করতেই নেপালদা ছেলেটাকে লক্ষ্য করে বলল, “দারুণ মোজা পরেছিস তো!”
আনমনে বসে ছিল ছেলেটা। মুহূর্তে খরখরে হয়ে উঠল চোখ দুটো। একটু আগের শুকনো মুখ শক্ত হয়ে উঠল ক্রমশ। ধারালো গলায় বলল , বাদাবনের কতটুকু জানেন বাবু ?
খোঁচাটা যে এমন হুল হয়ে ফিরবে ভাবতেই পারেনি কেউ। চাঁই নেপালদা অবশ্য দমবার পাত্র নয়। তড়িৎ গতিতে উত্তর ছুঁড়ে দিল, তুই জানিস বুঝি? তা বাঘ দেখাতে পারবি আমাদের?
শুধু বাঘই দেখবেন বাবু? আর কিছু নয়? একটুও না দমে বলল ছেলেটা।
আর কিছু নয় বলছিস কী রে? বাঘ, কুমির, কামট এসব দেখতেই তো এসেছি। পারবি দেখাতে?
পারব না কেন বাবু? তবে ব্যাপারটা কী জানেন, আপনারা আসেন বাঘ দেখতে। আর এখানে গাঁয়ের মানুষ বনে যায় ওই প্রাণীটির সঙ্গে যাতে দেখা না হয় সেই প্রার্থনা নিয়ে। বনবিবি কখনও শোনেন , কখনও শোনেন না। মানুষগুলোর কপাল পোড়ে তখন
বাঃ ! বেশ কথা শিখেছিস দেখছি! কোন ক্লাসে পড়িস? একটু চমৎকৃত হয়ে বলল নেপালদা।
বললাম না, বাদার কিছুই জানেন না। মৃদু হাসল ছেলেটা। পূর্ণিমার গোন চলছে। কদিন মাছের মরসুম এখন। ক্লাসে যাওয়ার সময় কোথায় বাবু?
পূর্ণিমার ভরা জোয়ারে বাদার নদীতে মাছের মরসুম। সন্দেহ নেই, ছেলেটা শেষ রাত থেকে লেগে ছিল সেই কাজে। পায়ের শুকনো কাদা সেই সময়ের। কিন্তু ছেলেটার মুখের ওই বাঁকা হাসি তখন নেপালদার মাথায় বোধ হয় আগুন ধরিয়ে দিয়েছে। বলল, তা তো বুঝলাম। কিন্তু একটু আগের কথা ভুলে যাসনি তো?
ভুলব কেন বাবু? ছেলেটা দমল না একটুও। কিন্তু তাহলে যে একটু দেরি করতে হবে আপনাদের। সেই শেষ রাতে বেরিয়েছি, বাড়ি যেতে হবে একবার।
ছেলেটার নাম অর্জুন সর্দারনেপালদা সম্মতি দিতে এরপর ও চলে গিয়েছিল বাড়ির দিকে। অনেকেই অবশ্য ভাবেনি, শেষ পর্যন্ত ফিরে আসবে সে। এমনকী, নেপালদাও। আর সত্যিই তাই। ক্রমশ সময় গড়িয়ে চলেছে, অথচ দেখা নেই। কতক্ষণ আর সময় নষ্ট করা যায়। তবে ব্যতিক্রম গৌর। ও আগেও এদিকে এসেছে। অনেক কিছুই চেনাজানা। ঘটনার সময় কেনাকাটা করতে গ্রামের দিকে গিয়েছিল। সব শুনে খোঁজ নিয়ে বলল, ছেলেটার বাড়ি কাছে নয়। মাইল তিনেক দূরে। উচিত ছিল ভ্যান রিকশার ভাড়াটা দিয়ে দেওয়া। তা যখন হয়নি, কিছুক্ষণ অপেক্ষা করতেই হবে।
নেপালদা নিজেই আপত্তি তুলছিল এরপর কিন্তু নেপালদার অনেক কিছু মেনে নিলেও এই ব্যাপারটায় সায় দেয়নি গৌর। শুধু বলেছে , ছোট ছেলেঅত দূর থেকে এসে দেখবে আমরা নেই, সেটা ঠিক হবে না নেপালদা।
গৌর দেখেনি ছেলেটাকে। কীসের জোরে একথা বলেছিল, তা সে-ই জানে। তবে সেটা যে নেপালদার সঙ্গে আমাদের বিচ্ছেদের কারণ হয়ে দাঁড়াবে ভাবতে পারিনি। কিন্তু সে তো পরের কথা। বরং আগের কথাই বলি এখন।
প্রায় ঘন্টা দুই পরে অর্জুন কিন্তু সত্যি এসে হাজির হল ঘাটে। প্রায় ছুটতে-ছুটতে। হাতে একটা ছোট পুঁটুলিতে দুএকটা জামাকাপড়। ততক্ষণে কমবেশি সবার মধ্যে প্রায় বিক্ষোভ শুরু হয়ে গেছে। ছেলেটাকে দেখেই প্রায় হুঙ্কার দিয়ে উঠল নেপালদা, তোর এত দেরি হবে বলিসনি তো ছোঁড়া! দিনটা নষ্ট করে দিলি।
অর্জুন অবশ্য দমল না। একগাল হেসে হাঁপাতে-হাঁপাতে বলল, সে কথা তো তখন শুধাননি বাবু। আমি কিন্তু বাড়িতে গিয়ে দেরি করিনি। ছুটে গেছি আর এসেছি।
ছেলেটা যে একটুও বাড়িয়ে বলেনি সেটা বোঝা যাচ্ছিল বেশ। সারা গা জবজব করছে ঘামে। হাঁপাচ্ছে রীতিমতো। মোক্ষম জবাব পেয়ে নেপালদা তাই আর কথা বাড়াল না। আপন মনে গজগজ করতে লাগল। ভটভটি ছেড়ে দিল।
একটা দিন কেটে গেছে তারপর। ঘোরা হয়ে গেছে আরও অনেকটাই। অর্জুনের কথায় ভটভটি ঢোকান হয়েছে কয়েকটা সরু খালে। কিন্তু উদ্দেশ্য সিদ্ধ হয়নি।
নেপালদা তো বটেই, ইতিমধ্যে অনেকেই টিপ্পনী কাটতে শুরু করেছে ওকে। তবে দরকারে ফাইফরমাশটা ভালই খাটছে ছেলেটা। তারই মধ্যে দারুণ একটা কাজ করে ফেলল। ভাটা শুরু হয়েছে। কয়েক জনের ইচ্ছেয় মাঝি নৌকো ঢুকিয়ে দিয়েছে একটা খালে দুদিকে ঘন জঙ্গল। বড়ো-বড়ো গাছে ছেয়ে রয়েছে আকাশ। এই দুপুরেও ছমছমে অন্ধকার। খানিক ঢুকতেই অর্জুন হঠাৎ জলের দিকে তাকিয়ে চেঁচিয়ে উঠল, জলের যা টান, এ মজা শিস্‌-খাল বাবু। এই ভাটায় আরও ভিতরে গেলে বিপদ হয়ে যাবে। নৌকো ফেরান।
শুনে হেসে উঠল সবাই। সবচেয়ে বেশি নেপালদা। ধমক দিয়ে বলল, “থাম ছোঁড়া। বাঘ দেখাবি বলে নিয়ে এসে ভয় পেয়ে গেলি এর মধ্যেই!
এই প্রথম দমে গিয়েছিল অর্জুন। কথা বাড়ায়নি আর। পরিণামটা টের পাওয়া গিয়েছিল অচিরেই। খালটা সরু হয়ে আসছিল ক্রমেই। খানিক বাদে মাঝি নিজেই ব্যাপারটা আঁচ করে বলল, এ মজা শিস্‌-খালই বাবু। আরও ভিতরে গেলে বিপদে পড়তে হবে।
কিন্তু বিপদের তখন যে আর বাকি নেই, বুঝতেও পারেনি কেউ। ফেরবার জন্য তাড়াতাড়ি ভটভটি ঘোরাতে গিয়ে হঠাৎ তার তলা মাটিতে আটকে গেল। শুধু তাই নয় ভটভটির পিছনের দিকের খানিকটা ঢুকে গেল পাড়ে ঘন এক হেঁতালঝাড়ের ভিতর। যথাসাধ্য চেষ্টা করেও মাঝি সরাতে পারল না।
ব্যাপারটা যে কতখানি ভয়ানক তখন বুঝতে আর বাকি নেই কারও। নদীর মাঝে নিরাপদে নৌকোয় বসে জঙ্গল দেখতে বেশ লাগে। কিন্তু সেই জঙ্গলে যখন নৌকোর গলুই আটকে যায়, তখন আর মজা নয়, শুরু হয় অন্য জিনিস। তার উপর, খানিক আগে খালের ধারে এক গাছের ডালে বাঁধা ছেঁড়া একটা গামছা দেখে এসেছি। দিন কয়েক আগেই নাকি ওখানে বাঘে মানুষ মেরেছে। এই জঙ্গলে যে বাঘ আছে সেটা অন্যদের জানিয়ে দেওয়ার জন্যই ওই নিশান। ব্যাপার দেখে কারও মুখে কোনও কথা নেই। ব্যতিক্রম নয় নেপালদাও। এদিকে ভাটায় দ্রুত জল নেমে চলেছে তখনযত দেরি হবে, নৌকো আরও বসে যাবে। ফের পুরো জোয়ার না আসা পর্যন্ত এই ভয়ানক জঙ্গলের মধ্যে নৌকোয় পড়ে থাকতে হবে সবাইকে
এই অবস্থায় আর সময় নষ্ট না করে তাগাদা দিয়ে মাঝিদের একজনকে সঙ্গে নিয়ে অর্জুন নেমে পড়ল সেই হেঁতালঝাড়ের ভিতর। ঠেলে বের করে দিল নৌকোপ্রায় ঘাম দিয়ে জ্বর ছাড়ল সবার।
বয়সে ছোট হলেও ছেলেটা যে বাদার অনেক কিছুই জানে এরপর মানতে বাধ্য হয়েছিল সবাই। জিজ্ঞাসা করতে ব্যাপারটা সাফ করেও দিয়েছিল ও। মজা শিস্‌-খাল, অর্থাৎ যে খালের অন্য মুখ জঙ্গলের ভিতর ক্রমশ সরু হয়ে  বন্ধ হয়ে গেছে, সেই খালে ভাটার জল নামে দ্রুত। স্রোতের টান তাই খুব বেশি। আর ফোড়ন-খাল, অর্থাৎ যে খালের দুটো মাথাই জঙ্গল ফুঁড়ে দুই দিকে কোনও বড়ো নদীতে মিশেছে, সেই খালে ভাটার জল নামে দুই মুখ দিয়েই। তাই স্রোতের টান তেমন বেশি হয় নাএমনকী  অনেক সময় দেখা যায়, খালে দুই বিপরীতমুখী স্রোত চলেছে দুই দিকে।
ব্যাপারটা জলের মতোই সহজ হয়তো। কিন্তু জলের টান দেখে সেটা বোঝা যে মোটেই সহজ কাজ নয় তা বলাই বাহুল্য। অর্জুনের খাতির তাই এরপর বেড়েছিল খানিকটা। অবশ্য বাঘ দেখাতে পারেনি বলে ও নিজেই দমে গিয়েছিল একটুনেপালদাও খোঁচাচ্ছিল মাঝেমধ্যে। এর খানিক বাদেই ঘটল সেই ব্যাপার।
অর্জুনের নির্দেশে ভটভটি তখন একটা ফোড়ন খালে ঢুকেছে। বেশ চওড়া খাল। ভাটা হলেও যথেষ্টই জল রয়েছে। দুদিকেই নিবিড় ঘন জঙ্গল। বড়ো-বড়ো গাছ। এই দুপুরেও মরা আলোয় ঝিমঝিম করছে চারপাশ। সেই খালের ভিতর খানিক এগিয়ে একটা শাখা বেরিয়েছে বাঁ দিকে। সেই বাঁকের কাছে ভটভটি পৌঁছোতে হাত দেখিয়ে চাপা গলায় চেঁচিয়ে উঠল অর্জুন, ওই দেখুন বাবু কুমির।
একসাথে সব কয়টা চোখ মুহূর্তে গিয়ে পড়ল অর্জুনের হাত লক্ষ্য করে। বাঁদিকের খালটা খানিক গিয়ে বাঁক নিয়েছে। সেই বাঁকের মুখে উঁচু পাড়ের উপর দিবানিদ্রা সারছে মস্ত এক কুমির। তাড়াতাড়ি নৌকো ঘোরান হল সেই খালের ভিতরঅত বড়ো কুমির দেখে ততক্ষণে রীতিমতো হইচই পড়ে গেছে। গোড়ায় দূর থেকেই প্রাণীটিকে দেখা হচ্ছিল। কিন্তু সাহস বাড়তে ধীরে-ধীরে খানিক কাছে নেওয়া হল নৌকো। নোনা জলের অত বড়ো কুমির আগে দেখেনি কেউ। নাক থেকে লেজের ডগা পর্যন্ত প্রায় ফুট কুড়ি লম্বা। হাঁ করে তাকিয়ে আছি সবাই। ভটভটির ইঞ্জিন থামিয়ে দেওয়া হয়েছে। প্রায় মিনিট দশেক কেটে গেছে। বিশাল প্রাণীটার কিন্তু সাড়াশব্দ নেই। চোখ বন্ধ। প্রায় মড়ার মতই পড়ে রয়েছে নদীর উঁচু পাড়ের উপর।
দেখে কে যেন বলল, এটা মরা কুমির নয়তো?
নেপালদা তৈরি হয়েই ছিল বোধ হয়। সায় দিয়ে বলল , তাই তো মনে হচ্ছে রে। একটু নড়েও তো নাকী রে অর্জুন, বাঘ দেখাবি কথা দিয়ে শেষে এক মরা কুমিরের কাছে নিয়ে এলি!
উত্তরে অর্জুন নীরবে একটু তাকাল নেপালদার দিকে। ঝিলিক দিয়ে উঠল চোখ দুটো। বলল , তা হবেও বা। নৌকো আরও কাছে নেবেন নাকি বাবু?
সাহস পেয়ে নেপালদা এবার মাঝিদের নৌকো আরও কাছে নিতে বলল। আদেশ পেয়ে ফের চালু হল ইঞ্জিন। চলতে শুরু করল ভটভটি। কিন্তু সামলাতে পারা গেল না। মাঝি গতি কমাবার আগেই নৌকো এগিয়ে গেল অনেকটা। প্রায় পাড়ের কাছে। তারপরেই ঘটল এক ভয়ানক  ব্যাপার। উপরে কুমিরটা সজাগ হয়ে উঠল মুহূর্তে। নড়ে উঠল লেজ। তারপর সড়াৎ করে ঢাল বেয়ে নেমে এল নীচের দিকে। ততক্ষণে ভটভটি গতি সামাল দিতে না পেরে আরও সামনে এসে পড়েছে। ফলে যা হবার তাই ঘটল। অত বড়ো কুমিরটা হুড়মুড় করে এসে পড়ল একেবারে নৌকোর উপর। কাত হয়ে  গেল নৌকো। সামনে ছিল খাওয়ার বড়ো ড্রামটা। লেজের ধাক্কায় উলটে গেল সেটাভাগ্যিস, নীচে কেউ সেই মুহূর্তে ছিল না। সবাই ছাদের উপর।তাই বড়ো বিপদ হল না। কিন্তু যা হল, তাও কম নয়। ছোট ভটভটি নৌকো। অত বড়ো কুমিরটা ওই ভাবে তার উপর এসে পড়তে মুহূর্তে কাত হয়ে গেল একদিকে। ততক্ষণে হুড়োহুড়ি পড়ে গেছে সবার মধ্যে, চিৎকার চ্যাঁচামেচি। ওদিকে কুমিরটাও তখন বেজায় ঘাবড়ে গিয়ে প্রায় দাপাদাপি জুড়ে দিয়েছে নৌকোয়। বিপজ্জনক ভাবে দুলতে শুরু করেছে ভটভটি। দাপাদাপিতে পাটাতন ভেঙে কুমিরটা একবার নৌকোর খোলের ভিতর ঢুকে গেলে সর্বনাশের কিছু আর বাকি থাকত না। কিন্তু তার আগেই প্রাণীটা খানিক সামলে নিয়ে ছিটকে পড়ল নদীর জলেআর দেখা গেল না। পুরো ব্যাপারটা ঘটতে দেড়-দুই সেকেন্ডের বেশি লাগেনি। কিন্তু তাতেই দারুণ আতঙ্কে প্রায় কাঠ হয়ে গেছে সবাই। তার মধ্যেই হঠাৎ খেয়াল হল, টাল সামলাতে না পেরে খোদ নেপালদা কখন পড়ে গেছে জলে। সাঁতার না জানায় হাবুডুবু খেতে খেতে স্রোতের টানে ভেসেও গেছে খানিকটা। আমাদের মধ্যে সাঁতার জানে অনেকেই। কিন্তু একটু আগে অত বড়ো কুমির দেখার পরে কে নামবে জলে! সবাই হায় হায় করে উঠলেও তাই জলে নামতে সাহস পাচ্ছে না কেউ। ইতস্তত করছে মাঝিরাও। সেই সময় অর্জুন একাই লাফিয়ে পড়ল জলে। তিরবেগে গিয়ে পড়ল নেপালদার কাছে। কিন্তু বিপদ আরও বাড়ল তাতে। ও কাছে যেতেই হাবুডুবু খেতে-খেতে নেপালদা দুহাতে জড়িয়ে ধরল তাকে। অত বড়ো চেহারার মানুষটা ওই ভাবে জাপটে ধরতে সামলাতে পারল না অর্জুন। জড়াজড়ি করে একসাথে ডুবে গেল দু”জনেই।
ব্যাপার দেখে তখন বাক্‌রোধ হয়ে গেছে সবার। সবাই যখন ভাবতে শুরু করছে দুজনের কার আর বাঁচার আশা নেই, সেই সময় ফের ভেসে উঠল দুজন। নেপালদা মড়ার মতো নেতিয়ে পড়েছে তখন। সাড় নেই শরীরে। অর্জুন ওই অবস্থায় তাকে দ্রুত টেনে আনল নৌকোর কাছে। ধরাধরি করে তোলা হল উপরে। নাক দিয়ে রক্ত গড়াচ্ছে। ব্যাপার কী, যখন ভাবছে সবাই, তখন অর্জুনই খোলসা করল সেটা। ততক্ষণে সে-ও লাফিয়ে উঠে পড়েছে নৌকোয়। ভাববেন না বাবু। উনি তখন এমন জড়িয়ে ধরেছিলেন যে, গোটা কয়েক ঢুঁসো আর ঘুসি মারতেই হল। নইলে ডুবে মরতাম দু’জনেই।
নেপালদার জ্ঞান ফিরতে অবশ্য বেশি সময় লাগেনি। তবে সে-দিনটা আর কারও পেটে কিছু পড়েনি। খাওয়ার জল নেই এক ফোঁটা। রান্নাও বন্ধ। কাছাকাছি গ্রামের ঘাটে ফিরতে রাত প্রায় এগারোটা। সারা সময়টা নেপালদা প্রায় গুম হয়ে রইল। এমনকী কলকাতায় ফিরেও কারও সঙ্গে যোগাযোগ রাখেনি। বলতে গেলে এক রকম ছাড়াছাড়িই হয়ে গেছে

ছবি: সৌরীশ মিত্র (সৌজন্য: আনন্দমেলা)
১২/৪/২০১৭

2 comments:

  1. Besh hoeche, ei Nepal dar moto lok der erom bhabei saesta howa uchit... bhaggo bhalo, je uni jibon ta phire peyechen, sei sasti theke sikhha nebar jonno...
    Sundor golpo...

    ReplyDelete