Wednesday, 4 January 2017

হরর গল্প (মোবাইল ভার্শন): লাশঘর

লাশঘর
শিশির বিশ্বাস
রেকৃষ্ণ সৎকার সমিতির গাড়িটা যখন ‘গুড হোমএর সামনে এসে দাঁড়াল রাত তখন সাড়ে আটটা কলকাতা শহরে সন্ধে রাত বলা যায় তবে আজকের কথা অনেকটাই আলাদা সকাল থেকেই টিপটিপে বৃষ্টি সেই সাথে মাঝেমধ্যেই ঝোড়ো হাওয়া এক কথায় দুর্যোগ দিনটা তবু কিছু ভাল ছিল সন্ধে থেকে বৃষ্টির তেজ আরও বেড়েছে অগত্যা সরু গলিটা প্রায় সুনসান জনমানুষ তো ছার একটা বাইক বা গড়িও নেই ভরসা বলতে কর্পোরেশনের গোটা কয়েক টিমটিমে বাতি এই বাদলার রাতে তাতে অন্ধকার দূর হয়েছে সামান্যই সেই আধো অন্ধকারে প্রায় ভুতের মতো দাঁড়িয়ে পুরোনো দিনের ছোট দুতলা বাড়িটা ‘গুড হোম গাড়ি থামিয়ে গোবিন্দ সাবধানে সেই বাড়ির দিকে তাকাল
নাম ‘গুড হোম’ হলেও আসলে লাশঘর মড়া বা লাশ নিয়ে অবশ্য গোবিন্দর কোনো অ্যালার্জি নেই সৎকার সমিতির গাড়ির ড্রাইভার লাশ নিয়েই কারবার গত দশ বছর এই চাকরিতে রয়েছে কয়েক হাজার লাশ শ্মশান গোরস্থান নয়তো লাশঘরে পৌঁছে দিয়েছে রাত দুপুরের বেরোতে হয় হামেশাই কিন্তু কোনোটাই এই ‘গুড হোমএর মতো নয় সেই দশ বছর আগে এক রাতে প্রথম যেদিন এখানে লাশ পৌঁছে দিতে এসেছিল সেই অভিজ্ঞতা আজও তাড়া করে বেড়ায়
জরুরি তলব পেয়ে সেদিন হসপিটাল থেকে এক লাশ নিয়ে যখন এই বাড়িতে পৌঁছেছিল রাত প্রায় দেড়টা আধা সাহেব পাড়া ভেবেছিল পথে নিশ্চয় লোকজন থাকবে কিন্তু কোথায় কীপ্রায় নির্জন রাস্তায় পুরোনো বাড়িটা প্রায় ভূতের মতো দাঁড়িয়ে ভারি কাঠের দরজা ভিতর থেকে বন্ধ গোড়ায় তো মনে হয়েছিল বোধ হয় চিনতে ভুল হয়েছে কিন্তু ভাল করে নজর করতে ভুল ভাঙল ভারি দরজার একপাশে ছোট এক নেম প্লেটে আরও ছোট করে লেখা ‘গুড হোম পাশে কলিং বেলের সুইচ সামান্য ইতস্তত করে সেই সুইচে চাপ দিয়েছিল তেমন বড় বাড়ি নয় বাইরে থেকে আওয়াজ পাওয়ার কথা কিন্তু কিছুই শুনতে পেল না গোড়ায় তো মনে হয়েছিল বেল খারাপ তবু দরজার কড়া নাড়বার আগে ফের একবার সুইচ টিপতে যাবে প্রায় বিনা নোটিসে মস্ত দরজাটা ক্যাঁচ করে খুলে গেল দরজার ওপাশে আধো অন্ধকারে দাঁড়িয়ে রোগা পাতলা একটা মানুষ মাথায় কদমছাঁট চুল হলদে ফ্যাকাসে শরীরে পোশাক বলতে ছোট এক শর্টস আধো অন্ধকারেও লোকটার হাড় সর্বস্ব বুকের পাঁজরা গুনে নেওয়া যায় গোবিন্দ রোগাপাতলা মানুষ কম দেখেনি কিন্তু এমন আগে দেখেছে বলে মনে করতে পারল না আধো অন্ধকারে লোকটা যেভাবে স্থির হয়ে ওর দিকে তাকিয়ে ছিল বেজায় ঘাবড়ে গিয়ে গোবিন্দ পিছিয়ে গেল কয়েক পা দেখে লোকটা অন্ধকারে দুপাটি দাঁত বের করে নাকি সুরে বলল  ‘ম্যাঁন হোঁয়াই আর ইউ নার্ভাসআঁই জোঁ জোঁসেফ স্মিথ
সেই কথায় প্রায় যেন ধড়ে প্রাণ ফিরে পেয়েছিল গোবিন্দ হ্যাঁ ‘গুড হোম’ নামে এই লাশঘরের মালিক জোসেফ স্মিথই বটে তবু কথা বলতে গিয়ে বার কয়েক ঢোঁক গিলতে হল
দুএক কথায় বিষয়টি ব্যক্ত করার পরে লোকটা গলা সামান্য ঝেড়ে নিয়ে বলল ‘ফোঁনে তোমার কথা খানিক আগে জানিয়েছে তা কাগজপত্র এনেছ?’
গাড়িতে কাগজপত্র ছিল ফিরে গিয়ে গোবিন্দ সেগুলো এনে দিল অন্ধকারেই লোকটা মিনিট কয়েক কাগজের উপর চোখ বুলিয়ে বলল ‘হুম ঠিক আছে তুমি ভিতরে গিয়ে বসো আমি লাশ নিয়ে আসছি
দরজার ওধারে প্রায় ঘুটঘুটে অন্ধকার এই মাঝ রাতে ওই অন্ধকারে লাশঘরের ভিতরে একা যাবার কথা শুনে প্রায় আঁতকে উঠে গোবিন্দ যথাস্থানে দাঁড়িয়ে রইল ওদিকে জোসেফ ততক্ষণে লম্বা পায়ে লাশগাড়ির পিছনের দরজা খুলে এক টানে স্ট্রেচারের অর্ধেক বের করে ফেলেছে এই অবস্থায় ট্রলিতে করেই লাশ নিয়ে যাওয়া হয় কিন্তু তেমন কিছু নেই দেখে গোবিন্দ যখন ভাবছে স্ট্রেচার ধরার জন্য হয়তো ডাকবে সেই সময় লোকটা হঠাৎ ধাঁ করে লাশটা পাঁজাকোলা করে তুলে ফেলল তারপর সামান্য কুঁজো হয়ে লম্বা পা ফেলে দরজা দিয়ে ঢুকে পড়ল অগত্যা পিছনে ছুটতেই হল গোবিন্দকে কাগজে সই করে বডি রিসিভ না করা পর্যন্ত ছুটি নেই তার
দরজা পার হয়ে অন্ধকারে কয়েক ধাপ সিঁড়ি উঁচু এক চাতালে উঠে বাঁ দিকে ঘুরলেই আর একটা দরজা পার হলেই বড় এক হলঘর ভিতরে টিমটিম করে একটা মাঝারি পাওয়ারের হলদে বাতি জ্বলছে সেই সামান্য আলোয় অতবড় ঘরটায় প্রায় গা ছমছম পরিবেশ কাঠের মেঝে হলেও ভিজে শ্যাওলা ধরা স্যাঁতসেঁতে দেয়াল ঝাঁঝালো ওষুধের গন্ধ দেয়ালে গোটা কয়েক মস্ত টিকটিকি শিকারের অপেক্ষায় স্থির হয়ে রয়েছে ফ্যাকাসে হলদে রঙের সেই টিকটিকিগুলোর দিকে তাকিয়ে গোবিন্দর সারা শরীর হঠাৎ কেমন শিরশির করে উঠল ও তাড়াতাড়ি ঘাড় নামিয়ে জোসেফের দিকে তাকাল খালি গায়ে লিকলিকে চেহারার লোকটা ততক্ষণে কাজে লেগে পড়েছে ঘরের মাঝে বড় এক টেবিলে বডিটা রেখে টর্চের আলোয় চোখের পাতা উলটে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে দেখছে এরপর অদ্ভুত কায়দায় চ্যাপ্টা এক চিমটে দিয়ে দুই ঠোঁট উলটে দেখে নিয়ে একগাল হেসে বলল ‘নাহ হাসপাতাল পার্টির কাছে যত্নেই ছিল দেখছি দিন চারেক ভালই থাকবে এখন একটু বসো বাপু ড্রয়ারে ঢুকিয়েই ছেড়ে দিচ্ছি তোমাকে
নতুন লাশের ব্যাপারে বুড়ো যে বেজায় খুঁতখুঁতে গোবিন্দ আগেই শুনেছিল তাই কিছুটা হলেও হাঁফ ছেড়েছিল এরপর কিন্তু সেই একটু সময় যে কতক্ষণ একেবারেই আঁচ করতে পারেনি হাড়ে হাড়ে মালুম পেল তারপর ঘরের একপাশের দেয়াল জুড়ে প্রমাণ সাইজের সারি সারি ড্রয়ার প্রতিটির সামনে একটা করে কার্ড ঝুলছে সেই কার্ডে ভিতরে ঢোকানো লাশের বিবরণ বুড়ো অবশ্য ইতিমধ্যে টেবিলের একধারে রাখা মোটা এক বাঁধানো খাতা খুলে ফেলেছে সেই খাতার কাজ শেষ হতে লাগল প্রায় মিনিট পনেরো তারপর টেবিলের লাশ ফাঁকা এক ড্রয়ারে ঢুকিয়ে সামনে লেবেল ঝুলিয়ে দিয়ে যখন কাগজে সই করে দিল নয় নয় করেও পৌনে একঘণ্টা সময় পার হয়ে গেছে সারাটা সময় সেই ভয়ানক ঘরের ভিতর প্রায় দম বন্ধ করে পড়ে থাকা ছাড়া উপায় ছিল না সই করা কাগজ ফেরত পেতে তাই আর এক মুহূর্ত দেরি করেনি
প্রথম দিনের সেই ভয়ানক অভিজ্ঞতা গোবিন্দ তারপর আর মন থেকে ঝেড়ে ফেলতে পারেনি আজও তাড়া করে বেড়ায় শুধু মাত্র এই কারণেই অনেক বার ভেবেছে ছেড়েই দেবে কাজটা কিন্তু অনেক চেষ্টা করেও বিকল্প একটা ব্যবস্থা না হওয়ায় ছাড়া হয়নি
গুড হোম নামের এই লাশঘরে আগে বেশি কাজ পড়ত না অবশ্য মাসে এক আধবার। তবু সেই আশঙ্কায় সিটিয়ে থাকত দুর্ভাগ্যই বলতে হবে ইদানীং প্রায়ই আসতে হচ্ছে। আসলে দিন কাল পালটে গেছে দিনের মধ্যে সৎকার আজকাল অনেক ক্ষেত্রেই হয় না ছেলেমেয়েরা বাইরে থাকে বিদেশ হলে তো কথাই নেই আসতে তিনচার দিন লেগে যায় অগত্যা গুড হোমের মতো লাশঘরই ভরসা
এই যেমন আজ সকাল থেকেই ঝড়-বাদল এক কথায় দুর্যোগের দিন সারাদিন কোনো ডাক না আসায় ভেবেছিল বাঁচা গেল বোধ হয় কিন্তু ঠিক সন্ধের মুখেই বেজে উঠল ফোন ধরতেই ওদিক থেকে সৎকার সমিতির ম্যানেজার হারাধন নন্দীর গলা লাশ আনতে হবে কল্যাণীর ওদিকে এক হাসপাতাল থেকে পৌঁছে দিতে হবে গুড হোমে শুনেই গলা প্রায় শুকিয়ে গিয়েছিল এই সন্ধের আগে গ্যারেজ থেকে গাড়ি বের করে অতদূর পৌঁছোতে সময় লাগবে যথেষ্টই তারপর লাস নিয়ে ফিরতেও সময় কম নয় কাঁচুমাচু হয়ে বলেছিল ‘আজকের রাতটা বাদ দিলে হয় না হারাধনদা এই জলকাদার পথ কথা দিচ্ছি কাল ভোরেই বের হয়ে পড়ব
তাতে প্রায় ধমকে উঠেছিল হারাধন নন্দী ‘খেপেছিসএকেই দিন চারেকের পুরোনো বডি ছেলে আমেরিকায় থাকে কথা ছিল আগামী কাল এসে পড়বে বডি তাই হাসপাতালেই রাখা ছিল ছেলে হঠাৎ খবর পাঠিয়েছে কী গোলমালে তাঁর আসতে আরও দিন চারেক লাগবে এদিকে আর এক বিপত্তি যে হাসপাতালে বডি ছিল তাদের মেশিনে গোলমাল গত কাল থেকে ঠিকমতো কাজ করছে না জানিয়ে দিয়েছে বডি তারা আর এক দিনও রাখতে পারবে না দেরি না করে রওনা হয়ে পড়
অগত্যা ঢোঁক গিলে গোবিন্দ বলেছিল ‘বাড়ির লোকজন কেউ থাকবে তো দাদা?’
বাড়ির লোকজন!’ হেসে উঠল হারাধন নন্দী ‘ওল্ড এজ হোমের পার্টি বাড়ির লোক পাবি কোথায়অসুস্থ হয়ে পড়তে তারা হাসপাতালে ভরতি করে খালাস এখন দায় আমাদের
কথা না বাড়িয়ে ম্যানেজার হারাধন নন্দী লাইন কেটে দিয়েছিল এরপর গোবিন্দও আর দেরি করেনি লাশের বাড়ির লোক নেই মানেই পুরো দায়িত্ব তার উপর অগত্যা দেরি না করে বের হয়ে পড়েছিল সেই দণ্ডেই
এই ঝড়জলের দিনেও বডি নিয়ে রাত সাড়ে আটটার মধ্যেই পৌঁছে গিয়েছিল গুড হোমের দরজায় বৃষ্টির বেগ মাঝে সামান্য কমলেও ফের বাড়তে শুরু করেছে দেরি করা যায় না গাড়ি থেকে নেমে গোবিন্দ দরজার বেল টিপল
গুড হোমের দরজায় বেল টিপে বেশিক্ষণ অপেক্ষা করতে হয় না সেই প্রথম দিনের মতো মিনিট দেড়েকের মধ্যেই খুলে যায় আজ সময় একটু বেশিই লাগল বার পাঁচেক বেল টেপার পরে ঘটাং করে দরজা খুলে যে মানুষটা উঁকি দিল তাকে একেবারেই আশা করেনি গোবিন্দ জোসেফের ছেলে টমাস বাবা না থাকলে কখনো ডিউটি সামলায় টমাস একেবারেই উলটো স্বভাবের সব দিক থেকেই বেঁটেখাটো গাঁট্টাগোট্টা চেহারা নেশায় চুর হয়ে থাকে ব্যবহার মোটেই ভাল নয় ওর অর্ধেক ইংরেজিই বুঝতে পারে না গোবিন্দ তাই পারতপক্ষে বেশি কথা বলে না তবু ওকে দেখে আজ কিছুটা যেন স্বস্তি পেল ব্যবহার যাই হোক লাশ নিয়ে এলে টমাস একেবারেই বসিয়ে রাখে না ড্রয়ারে চালান করে দিয়ে চটপট কাগজে সই করে দেয়
গোবিন্দ তাড়াতাড়ি হাতের কাগজপত্র তার দিকে বাড়িয়ে দিতে যাবে টমাস হঠাৎ খেঁকিয়ে উঠল ঘড়ঘড়ে জড়ানো গলায় যা বলল তার অর্থ এখানে জায়গা নেই বাপু সব ড্রয়ার ভরতি হয়ে রয়েছে ভেগে পড়ো
খানিক চেষ্টায় টমাসের কথার অর্থ বোধগম্য হতে গোবিন্দর মাথায় প্রায় আকাশ ভেঙে পড়ল কী সর্বনেশে কথাঢোক গিলে কোনোমতে বলল ‘তবে যে ম্যানেজারবাবু এখানে লাশ পৌঁছে দিতে বললেন নিশ্চয় কথা বলে নিয়েছেন
কী জানি হয়তো বলেছিলেন কিন্তু এখন জায়গা নেই আর অন্য কোথাও দেখ’ বলতে বলতে টমাস যেভাবে খেঁকিয়ে উঠল দুপা পিছিয়ে এল গোবিন্দ দুচোখ টকটকে লাল সন্দেহ নেই নেশাটা কিছু বেশিই হয়ে গেছে এমন আগে দেখেনি নিশ্চয় ছেলেটার মাথার ঠিক নেই নরম গলায় গোবিন্দ ব্যাপারটা বোঝাতে যাবে গলা সপ্তমে তুলে ফের খেঁকিয়ে উঠল টমাস দড়াম করে দরজাটা ওর মুখের উপর বন্ধ করে দিল ভাগ্যিস মাথাটা সরিয়ে নিতে পেরেছিল নইলে থেঁতলেই যেত হয়তো
এই অবস্থায় টমাসের সঙ্গে আর কথা চলে না গোবিন্দ পকেট থেকে মোবাইল বের করে ম্যানেজার হারাধন নন্দীকে ফোন করল কপাল একেই বলে লাইন পাওয়া গেল না নট রিচেবেল
সম্ভবত এই ঝড়জলের রাতে ওদিকের টাওয়ারে কোনো গোলমাল বার কয়েক চেষ্টা করে শেষে থামতেই হল মোবাইল ফের পকেটে চালান করে গোবিন্দ গাড়িতে উঠল এবার এমন আগেও হয়েছে তবে সে দিনের বেলা। জানাতে ম্যানেজারবাবুই অন্য ব্যবস্থা করেছে। সেখানে লাশ পৌঁছে দিয়েছে আজ সব দিক দিয়েই গোলমাল একে এই দুর্যোগের রাত তার উপর ম্যানেজারকেও পাওয়া গেল না ভাবতে গিয়ে অন্য এক জায়গার কথা মনে পড়ে গেল নতুন এক বেসরকারি হাসপাতাল একবার এমন সমস্যা হওয়ায় ম্যানেজারবাবু ওখানেই ব্যবস্থা করেছিল জায়গাটা খুব দূরে নয় একবার ঢুঁ মারা যায় হয়তো এর মধ্যে টেলিফোনে ম্যানেজারবাবুকেও পাওয়া যেতে পারে
বৃষ্টির তেজ ক্রমশ বাড়ছে অযথা দেরি না করে গাড়িতে স্টার্ট দিল গোবিন্দ গাড়ি ব্যাক করে বড় রাস্তায় পড়েছে হঠাৎ পকেটে মোবাইল বেজে উঠল নিশ্চয় ম্যানেজারবাবু তড়িঘড়ি গাড়ি সাইড করে পকেট থেকে মোবাইল বের করে বাটন টিপেই কানের কাছে ধরল
অতি আগ্রহে মোবাইলে কলিং নম্বর লক্ষ করেনি হ্যালো বলতেই ওদিক থেকে পরিচিত সেই নাকি সুর ‘হ্যাঁল্লো বাঁবু তুঁমি বডি নিয়ে এসেছিলে নাকি?’
টেলিফোনের ওদিকে আর কেউ নয় খোদ গুড হোমের মালিক জোসেফ
হ্যাঁ গিয়েছিলাম তো’ হতাশ গলায় গোবিন্দ বলল
এঁই ঝঁড়জলের রাতে বডি নিয়ে কোথায় যাবেচঁলে এস এখানে কুঁইক’ ওদিক থেকে জোসেফের উত্তর
তবে তবে যে টমাস বলল জায়গা নেই!’ অবাক হল গোবিন্দ
আঁরে ছাড়ো ওর কথা বাঁবার এত দিনের কারবার গুড উইল দুদিনে লাটে তুলবে ছোঁড়াতুঁমি চলে এসো বাবু
কথা শেষ করে লাইন ছেড়ে দিল জোসেফ গোবিন্দও আর এক মুহূর্ত দেরি করল না গাড়ি ঘুরিয়ে ফের ছুটল গুড হোমের দিকে
দরজা খুলে জোসেফ ওর অপেক্ষায় বাইরেই দাঁড়িয়ে ছিল গোবিন্দ গাড়ি থামাতেই সেই আগের মতোই দুসারি দাঁত বের করে নিঃশব্দে হাসল তারপর সেই পরিচিত স্বরে বলল ‘তুঁমি বসো বাবু আঁমি বডি নিয়ে আসছি
রাতে এখানে এলে ইদানীং আর ভিতরে যায় না গোবিন্দ বডির সঙ্গে কাগজপত্রগুলোও বুড়োর হাতে ধরিয়ে দিয়ে গাড়িতেই বসে থাকে কাজ সারা হলে সই-সাবুদ করে জোসেফই পৌঁছে দিয়ে যায় কিন্তু আজ ঝড়জলের রাতে এই নির্জন পথে একা গাড়িতে থাকতে ভরসা হল না ইতিমধ্যে গাড়ির পিছনের দরজা খুলে বডি তুলে ফেলেছে জোসেফ ও কাগজপত্র হাতে তার পিছনে পায়ে পায়ে ঢুকে পড়ল ভিতরে
বুড়ো ভিতরে ঢুকে মস্ত টেবিলের উপর বডি নামিয়ে রাখতেই গোবিন্দ নরম গলায় বলল ‘একটু তাড়াতাড়ি ছেড়ে দিলে ভাল হয় স্যার বাইরে ঝড়জলের যা
কিন্তু ওর কথা শেষ হবার আগেই বুড়ো প্রায় আঁতকে উঠল ‘এঁ যেঁ প্রায় রটন বডি নিয়ে এসেছ বাবু!’
কড়া ওষুধ দেওয়া বডির অবস্থা যে ভাল নয় জানাই ছিল গোবিন্দ কথা না বলে হাতের কাগজগুলো এগিয়ে দিল সামান্য উলটে দেখে জোসেফ হতাশ গলায় বলল ‘চাঁরদিন আগের বডি রাঁখতে হবে আরও সাতদিনএঁখুনি ব্যবস্থা না নিলে সাত দিন পরে লাশ নয় বাবু পাঁওয়া যাবে স্কেলিটনটা। গুঁড হোমের বদনাম হয়ে যাবে!
বুড়ো ফের কী বলে ওঠে গোবিন্দ তাড়াতাড়ি বলল ‘এ ব্যাপারে গুড হোমের সুনাম রয়েছে বলেই তো ছুটে আসি স্যার যা করতে হয় করুন
জোসেফ অবশ্য গোবিন্দর উত্তরের জন্য অপেক্ষা করেনি ততক্ষণে ওষুধপত্রের ঢাউস একটা বাক্স টেবিলে নামিয়ে খুলে ফেলেছে বড় একটা সিরিঞ্জ রেডি করে বোতল থেকে অনেকটা ফর্মালিন নিয়ে একটু পরেই জোসেফ বডির বিভিন্ন স্থানে পুশ করতে শুরু করল খালি করে ফেলল পুরো বোতলটাই তারপর কী একটা ওষুধ বডির উপর স্প্রে করে শুরু করল ম্যাসেজ ওষুধের গন্ধ তো ছিলই এবার লাশের উপর জোসেফের সরু দুটো হাত দ্রুত চলতে শুরু করতেই গা গুলিয়ে উঠল গোবিন্দর বেশ বুঝতে পারছিল বুড়ো যা খুঁতখুঁতে মানুষ লাশের ব্যবস্থা না করে আর কাগজপত্রে হাত দেবে না বুড়োর কাজ শেষ হতে কতক্ষণ লাগবে জানা নেই ও কী করবে ভাবছে মুশকিল আসান করে দিল জোসেফ নিজেই টেবিলে লাশের উপর হাত চালাতে চালাতেই বলল ‘বাঁবু এবার কিছু সিক্রেট কাজ আছে তুঁমি বরং বাইরে গাড়িতে গিয়ে বসো আঁধ ঘণ্টার মতো লাগবে কাঁজটা হয়ে গেলেই পেপার সই করে দিচ্ছি
মরা লাশ সংরক্ষণের ব্যাপারে গুড হোমের জোসেফের যে কিছু একান্ত গোপনীয় ক্রিয়াকর্ম রয়েছে জানা ছিল গোবিন্দর সেই দৌলতে আধপচা লাশ এক মাস পরেও মনে হবে এক দিন আগের বলা যায় বুড়োর এই হাতের কাজের কারণেই গুড হোমের নামডাক সবাই ছুটে আসে বলা বাহুল্য সেসব একেবারেই গোপনীয় ব্যাপার গোবিন্দ বলল ‘তাহলে বাইরে গাড়িতে গিয়ে বসছি আমি
মুহূর্তে উঠে দাঁড়িয়ে গোবিন্দ বের হয়ে পড়ল ঘর থেকে বলা যায় হাঁফ ছেড়ে বাঁচল
বুড়ো আধ ঘণ্টার মতো লাগবে বলেছিল কিন্তু একটু একটু করে প্রায় ঘণ্টা দেড়েক পার হয়ে গেল তখনও ওদিকে থেকে কোনো সাড়াশব্দ নেই আরও কিছুক্ষণ অপেক্ষার পরে গোবিন্দ গাড়ি থেকে নেমে দরজার সামনে এসে দাঁড়াল বেরোবার সময় দরজাটা সামান্য টেনে দিয়েছিল সেইভাবেই রয়েছে ঠেলে সরিয়ে ও ভিতরের দরজার সামনে এসে দাঁড়াল এই দরজাটাও ও হালকা ভাবে টেনে দিয়েছিল এখন ভিতর থেকে বন্ধ ও বেল টিপবে কিনা ভাবছে ভিতরে মানুষের আওয়াজ শুনতে পেল কেউ উত্তেজিত গলায় কথা বলছে কিন্তু ভারি দরজার কারণে বুঝতে পারল না বুড়োর কাজ এখনও শেষ হয়নি ভেবে ও ফের গাড়িতে এসে বসল ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখল রাত সাড়ে দশটা আর কতক্ষণ এভাবে থাকতে হবে ভেবে না পেয়ে ম্যানেজার হারাধন নন্দীকে ফের ফোন করবে কিনা ভাবছে ওই সময় মোবাইলটা বেজে উঠল
বের করেই দেখে খোদ ম্যানেজার হারধন নন্দীরই ফোন রিসিভ করতেই ওদিক থেকে হারাধন নন্দীর উত্তেজিত গলা ‘কী সর্বনেশে কাজ করেছ গোবিন্দতোমার চাকরি তো গেছেই টানাটানি পড়বে আমার চাকরি নিয়েও
সন্ধের পর থেকে হেনস্তা এযাবৎ কম হয়নি তাই ম্যানেজারের ধমক খেয়েও গোবিন্দর কোনো প্রতিক্রিয়া হল না ঠাণ্ডা গলায় বলল ‘কেন কী হয়েছে হারধনদা?’
তুমি কোথায় এখনবাড়িতে?’
বাড়িতে! বাড়িতে কেনগুড হোমে বুড়ো জোসেফের কাছে বডি জমা করে বাইরে গাড়িতে বসে আছি এখনো কাগজ সই হয়নি
কয়েক মুহূর্ত ওদিকে কোনো কথা নেই তারপর হারাধন নন্দীর ভয়ার্ত গলা ‘জোসেফ বডি জমা নিয়েছে?’
হ্যাঁ হারাধনদা বডির অবস্থা মোটেই ভাল নয় বলে ওষুধপত্র লাগাতে লাগাতে আমাকে বাইরে অপেক্ষা করতে বলল
গোবিন্দ যা বলছি একটু ঠাণ্ডা মাথায় শোন গুড হোমে বডি রাখার নাকি জায়গা নেই আমি টমাসকে বলে দিচ্ছি ওর কাছে থেকে বডি নিয়ে কাছেই ওরিয়েন্ট হসপিটালে পৌঁছে দাও কথা বলেছি ওখানে ব্যবস্থা  হয়ে যাবে
কেন হারাধনদাজোসেফ তো তেমন কিছু বলল না!’ অবাক হয়ে গোবিন্দ প্রশ্ন করলেও ওদিকে থেকে কোনো উত্তর এল না হারাধন নন্দী লাইন কেটে দিয়েছে
হতচকিত গোবিন্দ ফের তাঁকে ফোন করবে কিনা ভাবছে সশব্দে গুড হোমের দরজা খুলে বেরিয়ে এল টমাস ‘ইউ বাস্টার্ড তোমাকে তোমাকে গুলি করে মারব আমি!’
নেশাখোর টমাস এভাবেই কথা বলতে অভ্যস্ত গোবিন্দ মোলায়েম গলায় বলল ‘কেন গো দাদাকী অপরাধ?’
তোমাকে আমি বলেছিলাম না গুড হোমে বডি রাখার জায়গা নেই
বলেছিলেন তো চলেও তো গিয়েছিলাম তারপর ফের
তারপর ফের ফিরে এসে’ গোবিন্দর কথা কেড়ে নিয়ে টমাস বলল ‘লাশ নিয়ে চোরের মতো ভিতরে ঢুকেছ দশ নম্বর ড্রয়ারে আমার বাবার বডি ছিল সেটা বের করে বাইরে টেবিলে রেখে ড্রয়ারের ভিতর তোমার আনা লাশ ঢুকিয়ে দিয়েছআস্পর্ধা তো কম নয়!’
জোসেফ সাহেবের ব…!’ কথা শেষ করতে পারল না গোবিন্দ মুখটা হাঁ হয়ে আটকে গেল
হ্যাঁ জোসেফ সাহেবের বডি আজ সন্ধ্যেয় হঠাৎই মারা গেছেন উনি সেরিব্র্যাল অ্যাটাক
লাশগাড়ি চালিয়ে গোবিন্দর বুকের পাটা কিছু বেড়েছে সন্দেহ নেই নইলে ওই কথা শোনার পরেও গাড়িতে স্টার্ট দিতে পেরেছে তারপর ঘটাং–ঘট শব্দে একদম টপ গিয়ার পিছনে টমাস তখন চ্যাঁচাতে শুরু করেছে ‘যাচ্ছ কোথায়! বডি আর কাগজপত্রগুলো নিয়ে যাও

কিন্তু তাতে কিছুমাত্র কান দিল না গোবিন্দ পকেটে মোবাইলটাও বেজে উঠল ওই সময় সন্দেহ নেই ম্যানেজারবাবু কিন্তু মরে গেলেও এই রাতে গুড হোমে আর লাশ আনতে যাচ্ছে না তেমন বুঝলে ছেড়েই দেবে চাকরিটা
প্রথম প্রকাশিত:  ‘শুকতারা’ ১৪২৩ শারদীয়া সংখ্যা
আপলোড: ২/৭/২০১৭ 

3 comments: