Thursday, 5 January 2017

গল্প (মোবাইল ভার্শন): হারজিত্‌


জ কদিন ধরে সমানে বৃষ্টি ঘন দুর্যোগ কখনো ঝোড়ো হওয়া মজা নদীনালাগুলোও দু’কূল ছাপিয়ে গজরাচ্ছে কিন্তু এসব দমাতে পারেনি জেলার সাড়া জাগানো অনুর্দ্ধ আঠারো বয়সি ছেলেদের দশ মাইল দৌড় প্রতিযোগিতাকে সেই ১৯৪৭ সাল থেকে প্রতিযোগিতাটি নিয়মিত অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে নির্দিষ্ট দিনে, নির্দিষ্ট সময়ে এবারও তার ব্যতিক্রম হয়নি
পঁচিশজন প্রতিযোগী আগের দিন যথাসময়ে পৌঁছে গেছে নূরপুর হাই স্কুলে রাতটা এখানে কাটিয়ে পরের দিন কাকভোরে স্টার্টারের সংকেত পেলেই বেরিয়ে পড়বে হাইওয়ে ধরে ছুটতে শুরু করবে
দৌড় প্রতিযোগিতার এত বছরের ইতিহাসে এবার একটা বিশেষ ঘটনা ঘটতে চলেছে গত দুবছর পর পর চ্যাম্পিয়ন হয়েছে জেলার সেরা দৌড়বীর অশোক মিত্র এবছরও যদি প্রথম হতে পারে, তাহলে হ্যাট্রিক করার এক দুর্লভ সম্মানের অধিকারী হতে পারবে তবে এবার ওর সবচেয়ে বড় প্রতিদ্বন্দী সূতাহাটির সিরাজুল হক টগবগে তেজি ঘোড়া গতবারের প্রতিযোগিতায় তৃতীয় হয়েছিল তারপর এক বছরে অসাধারণ উন্নতি করেছে এবছর জেলার এক ক্রীড়া প্রতিযোগিতায় আটশো এবং দেড় হাজার মিটার দৌড়ের দুটি ইভেন্টেই সে ছিল অশোকের সবচেয়ে নিকটতম প্রতিদ্বন্দী অশোক দুটিতে জিতলেও লড়াই হয়েছে হাড্ডাহাড্ডি  শেষ মুহূর্তের আগে পর্যন্ত অশোককে নিশ্চিন্ত হতে দেয়নি সুতরাং সন্দেহ নেই সিরাজুল এবার লড়বে অশোকের সমর্থকদের তাই চিন্তার শেষ নেই কৌতূহলের শিকার কর্মকর্তারাও অশোক কি পারবে তার সম্মান ধরে রাখতে?
যাকে নিয়ে এত জল্পনা, তাকে দেখে কিন্তু কিছু বোঝার উপায় নেই উত্তেজনায় রাতে অনেকের চোখে ঘুম না এলেও অশোক সবার আগে শুতে গেছে তারপর ভোর হতে যথাসময়ে প্রস্তুত হয়ে দাঁড়িয়ে গেছে স্টার্টিং পয়েন্টে
সারা রাত অঝোর বর্ষণের পর বৃষ্টির তেজ এখন কিছু কম পিঠে নম্বর আঁটা ডোরাকাটা গেঞ্জি আর প্যান্ট ভিজে সপসপ করছে মাথায় রানিং হ্যাট চোখের উপর সামান্য নামিয়ে দিয়ে বৃষ্টির ছাঁট যথাসম্ভব আটকে সমান তালে হাইওয়ে ধরে ছুটছে অশোক বৃষ্টির ফোঁটাগুলো তীক্ষ্ণ ফলার মতো বিঁধছে কিন্তু তাতে কাবু নয় ও এই রকম বৃষ্টি মাথায় করে সে বহুদিন প্র্যাকটিস করেছে এই হাইওয়ের উপর
পরপর কয়েকজন অতি উৎসাহী পিছন থেকে টপকে চলে গেল দৌড় সবে শুরু হয়েছে অশোক বিচলিত হল না দূর পাল্লার দৌড়ের নিয়মই এই গোড়ায় যত পারো দম ধরে রাখো অযথা খরচ করো না মাথা ঠাণ্ডা রাখো বিট্ করার জন্য অনেক সময় আছে কিন্তু দম হারিয়ে ফেললে সব শেষ যত প্রতিযোগীই থাক, বেশির ভাগই মাঝপথে দম হারিয়ে রণে ভঙ্গ দেয় আসল লড়িয়েদের দেখা পাওয়া যায় মাইল পাঁচেক পর থেকে আসল লড়াই তখনই শুরু হয়
ঠিক চার মাইলের মাথায় আমোদপুরের বাঁক বৃষ্টি অনেকটা ধরে এসেছে ইতিমধ্যে হাইওয়ের দুধার জলে থইথই ন্যাশানাল হাইওয়ে এখান থেকে বাঁ দিকে বেঁকে গেছে ডানদিকে আর একটা উঁচু কাঁচা রাস্তা আসলে এটা একটা বাঁধ মাইল কয়েক দূরে নদীর জল আটকাবার জন্য তৈরি হয়েছিল নদীর ধার দিয়ে নতুন পাকা বাঁধ তৈরি হবার পরে এখন আর তেমন গুরত্ব নেই আমোদপুরের বাঁকে ঘুরবার মুখে হঠাৎ ডান দিকে নজর পড়তেই চোখের পাতা কুঁচকে ওঠে অশোকের ততক্ষণে বাঁ দিকে মোড় নিয়েছে ছুটতে ছুটতেই পিছন ফিরে তাকায় বাঁধের ডানদিক জলে থইথই করছে ঘোলা জল বড় বড় ঢেউ সমানে আছড়ে পড়ছে বাঁধের উপর ভীষণ টান জলের ভয়ানক একটা সন্দেহ ওর মাথার ভিতর উঁকি দিয়ে ওঠে, তবে কি নতুন বাঁধ ভেঙে বান আসছে? ঢেউয়ের এত তেজ কোত্থেকে আসে! এমন ভয়ানক ঘুর্ণি!
দূরপাল্লার দৌড়ে যেটা একেবারেই নিষেধ, তাই করে বসল আশোক দুম করে দাঁড়িয়ে পড়ে পায়ে পায়ে কাঁচা বাঁধের দিকে এগিয়ে গেল ব্যাপারটা একটু ভাল করে দেখে যাওয়া দরকার যদি সত্যিই নতুন বাঁধ ভেঙে গিয়ে থাকে, সম্ভবত এখনও এদিকে কারো নজরে পড়েনি পথে কাউকে পেলে সতর্ক করে দেবে মিনিট কয়েক পর্যবেক্ষণ করে অশোকের বুঝতে বাকি রইল না তার অনুমান অভ্রান্ত ফিরে যাবার জন্য প্রস্তুত হতে গিয়েও হঠাৎ খানিক দূরে চোখ পড়তে ভুরু দুটো কুঁচকে উঠল বাঁধ ধরে এগিয়ে গেল সেদিকে
কী সর্বনাশ! পুরোনো কাঁচা বাঁধে সরু একটা ফাটল ধরেছে যে! চিনচিন করে জল চোঁয়াতে শুরু করেছে আর কিছুক্ষণের মধ্যেই হয়তো জলের তোড়ে ভেঙে পড়বে বন্যার জলে তলিয়ে যাবে গ্রামের পর গ্রাম খেতের ফসল অশোক আর ভাবতে পারে না মুহূর্তে লাফিয়ে পড়ল ওধারে খেতের উপর তারপর জলকাদা ভেঙে ছুটতে শুরু করে দূরে গ্রামের দিকে
কিছক্ষণের মধ্যে সামনে একটা গ্রামে পৌঁছে উঁচু মতো একটা ঢিপির উপর উঠে দাঁড়ায় তারপর দুহাত মুখের দুপাশে এনে উদ্দাম কণ্ঠে হেঁকে ওঠে, ‘হে-এ-এ-ই- ঝুড়ি কোদাল বাঁশ খোঁটা যে যা হাতের কাছে পান, নিয়ে এক্ষুনি আমার সঙ্গে আসুন নদীর নতুন বাঁধ ভেঙে বান আসছে পুরোনো বাঁধেও ফাটল দেখা দিয়েছে এক্ষুনি মেরামত না করলে বন্যার হাত থেকে কেউ বাঁচবে না
দেখতে দেখতে কয়েকশো মেয়ে পুরুষ বৃষ্টি মাথায় করে বেরিয়ে এল ঘর থেকে কে চ্যাঁচায় অমন করে!
গাঁয়ের শীতলাতলার ভিটের উপর থেকে তখনও ভেসে আসছে বজ্রগম্ভীর স্বর, ‘গোয়ালে গোরু,মোষ যা আছে দড়ি খুলে দিন বাড়ির শিশু আর অক্ষমদের পাঠিয়ে দিন হাইওয়ের উপর বাকি সবাই ঝুড়ি কোদাল নিয়ে আমার সঙ্গে আসুন আর এক মুহূর্ত সময় নষ্ট নয়
একটু বাদেই দেখা গেল, গাঁয়ের কয়েকশো মেয়ে পুরুষ ঝুড়ি,কোদাল, বাঁশ,খুটি হাতে জল-কাদা ভেঙে ছুটছে বাঁধের দিকে সবার আগে এক কিশোর
বাঁধের ফাটল ধরে জল ততক্ষণে বেশ জোরেই চোঁয়াতে শুরু করেছে ওধারে থইথই জলের ঢেউ দেখে আতঙ্কে বোবা হয়ে যায় মানুষগুলো অশোক মুহূর্তে চাঙা করে তোলে তাদের, ‘হে--, ভয় পাবেন না কেউ জীবন পণ করে শপথ নিন সবাই মাটি ফেলুন বাঁধের উপর খোঁটা বসাতে থাকুন ঢেউয়ের সাধ্য নেই বাঁধ ভাঙে
মন্ত্রের মতো কাজ হয় মুহূর্তে ভিজে খেতের উপর কয়েকশো কোদাল পড়তে শুরু করে ঝুড়ি ভরতি মাটি পড়তে থাকে বাঁধের উপর কয়েক মিনিট ওদের কাজ লক্ষ্য করে অশোক বুঝতে পারে আরও মানুষ চাই আরও বাঁশখুঁটি পুরোনো বাঁধে এমন ফাটল আরও ধরতেই পারে বজ্রকণ্ঠে ফের হেঁকে ওঠে ও, ‘হে---, জনা কয়েক জোয়ান বাঁধ বরাবর টহল দিতে থাকুন এমন ফাটল আরও থাকতে পারে সামাল দেবার চেষ্টা করুন আমি আরও মানুষ নিয়ে আসছি মনে রাখবেন, মুহূর্তের জন্যও যেন কাজ বন্ধ না হয়
কথা শেষ করেই জনা কয়েক পুরুষকে সঙ্গে নিয়ে অশোক ফের জলকাদা ভেঙে ছুটতে শুরু করে আরও মানুষ চাই আশপাশের প্রতিটি গ্রামে এখনই পৌঁছে দিতে হবে এই সংবাদ
এদিকে বিজয়নগরে উপস্থিত সবাই অবাক হয়ে দেখল, সবার আগে ফিতে স্পর্ষ করল সিরাজুল তারপর একে একে আরও কয়েকজন কিন্ত অশোক কোথায়? চিন্তিত হয়ে পড়ল সবাই এমন হবার কথা নয় খানিক বাদে কর্মকর্তাদের কয়েকজন জীপ নিয়ে বেরিয়ে পড়ল তার খোঁজে
আমোদপুরের পুরোনো বাঁধের উপর যখন তারা অশোককে খুঁজে পেল, কর্তব্যরত কয়েক হাজার মানুষের সঙ্গে সে তখন মাটি তুলছে গায়ের স্পোর্টস গেঞ্জি কাদায় মাখামাখি হলেও পিঠের নম্বরটা তখনও উজ্জ্বল
এর পরের ঘটনা অনেকেরই জানা বাংলার সেই ভয়াবহ বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল একাধিক জেলা ভেসে গিয়েছিল গ্রামের পর গ্রাম ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল প্রায় দুই কোটি মানুষ কিন্তু এক কিশোরের কর্মতত্পরতায় আমোদপুরের বাঁধ রক্ষা পেয়ে যেতে বেঁচে গিয়েছিল বারোটিরও বেশি গ্রাম, আর কয়েক হাজার মানুষ এছাড়া কয়েক কোটি টাকার সম্পদ সেই দুর্যোগের দিনে এই গ্রামগুলিতে আশ্রয় পেয়েছিল আশপাশের গ্রামের বহু গৃহহীন মানুষ আর গবাদি পশু
মাস কয়েক পরের কথা এক ভাবগম্ভীর অনুষ্ঠানে দৌড় প্রতিয়োগিতার পুরষ্কার বিতরণ করা হচ্ছে প্রথমেই পুরষ্কার নিতে উঠল বিজয়ী সিরাজুল হক তুমুল হর্ষদ্ধনির মধ্যে সভাপতির হাত থেকে পদকটি নিয়েই সে ছুটে নেমে এল মঞ্চ থেকে সামনের সারিতে বসা অশোকের কাছে এসে তার গলায় পরিয়ে দিল সেটা
কী ঘটল বুঝে ওঠার আগেই সিরাজুল ফের উঠে এল মঞ্চের উপর তারপর মাইক্রোফোনের সামনে দাঁড়িয়ে বলতে শুরু করল, ‘উপস্থিত সুধীবৃন্দ আজকের এই পুরষ্কারের যোগ্য আমি নই স্পোর্টসম্যান অশোকের কাছে ভীষণভাবে হেরে গেছি আমি কাউকে বলতে পারিনি সেই দিনটির পরে কয়েক রাত আমি দু’চোখের পাতা এক করতে পারিনি সেদিন অশোকের আগেই ছিলাম আমি আমোদপুরের কাছে এসে জলের টান দেখে সন্দেহ আমারও হয়েছিল কিন্ত...
কথা শেষ করতে পারে না সিরাজুল দু’হাতে মুখ ঢেকে কেঁদে ফেলে ঝরঝর করে

ছবি: কিশোর ভারতী পত্রিকার সৌজন্যে
প্রথম প্রকাশিত: ‘কিশোর ভারতী’  শ্রাবণ ১৩৯১ 
আপলোড: ১০/৮/২০১৭

ছেলেবেলার ভাললাগা ভূতের গল্প (মোবাইল ভার্শন): বোমাইবুরুর জঙ্গলে (বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়)

বোমাইবুরুর জঙ্গলে
বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়
জঙ্গলের বিভিন্ন অংশ সার্ভে হইতেছিল। কাছারি হইতে তিন ক্রোশ দূরে বোমাইবুরুর জঙ্গলে আমাদের এক আমিন রামচন্দ্র সিং এই উপলক্ষে কিছুদিন ধরিয়া আছে। সকালে খবর পাওয়া গেল রামচন্দ্র সিং হঠাৎ আজ দিন দুই-তিন হইল পাগল হইয়া গিয়াছে।
শুনিয়া তখনই লোকজন লইয়া সেখানে গিয়া পৌঁছিলাম। বোমাইবুরুর জঙ্গল খুব নিবিড় নয়, খুব ফাঁকা উঁচু-নিচু প্রান্তরে মাঝে মাঝে বড় বড় গাছ, ডাল হইতে সরু দড়ির মতো লতা ঝুলিতেছে, যেন জাহাজের উঁচু মাস্তুলের সঙ্গে দড়াদড়ি বাঁধা। বোমাইবুরুর জঙ্গল সম্পূর্ণরূপে লোকবসতিশূন্য।
গাছপালার নিবিড়তা হইতে দূরে ফাঁকা মাঠের মধ্যে কাশে ছাওয়া ছোট্ট দুখানা কুঁড়ে। একখানা একটু বড়, এখানাতে রামচন্দ্র আমিন থাকে, পাশের ছোটখানায় তার পেয়াদা আসরফি টিণ্ডেল থাকে। রামচন্দ্র নিজের কাঠের মাচার উপর চোখ বুজিয়া শুইয়া ছিল। আমাদের দেখিয়া ধড়মড় করিয়া উঠিয়া বসিল। জিজ্ঞাসা করিলাম-কি হয়েছে রামচন্দ্র? কেমন আছ?
রামচন্দ্র হাতজোড় করিয়া নমস্কার করিয়া চুপ করিয়া রহিল।
কিন্তু আসরফি টিণ্ডেল সে কথার উত্তর দিল। বলিল-বাবু, একটা বড় আশ্চর্য কথা। আপনি শুনলে বিশ্বাস করবেন না। আমি নিজেই কাছারিতে গিয়ে খবর দিতাম, কিন্তু আমিনবাবুকে ফেলে যাই বা কি করে? ব্যাপারটা এই, আজ কদিন থেকে আমিনবাবু বলছেন একটা কুকুর এসে রাত্রে তাঁকে বড় বিরক্ত করে। আমি শুই এই ছোট ঘরে, আমিনবাবু শুয়ে থাকেন এখানে। দু-তিনদিন এই রকম গেল। রোজই উনি বলেন আরে কোত্থেকে একটা সাদা কুকুর আসে রাত্রে। মাচার ওপর বিছানা পেতে শুই, কুকুরটা এসে মাচার নিচে কেঁউ কেঁউ করে, গায়ে ঘেঁষ দিতে আসে। শুনি, বড়-একটা গা করি নে। আজ চারদিন আগে উনি অনেক রাত্রে বললেন-আসরফি, শিগগির এসো বেরিয়ে, কুকুরটা এসেছে। আমি তার লেজ চেপে ধরে রেখেছি। লাঠি নিয়ে এস।
আমি ঘুম ভেঙে লাঠি-আলো নিয়ে ছুটে যেতে দেখি-বললে বিশ্বাস করবেন না হুজুর, কিন্তু হুজুরের সামনে মিথ্যে বলব এমন সাহস আমার নেই-একটি মেয়ে ঘরের ভিতর থেকে বার হয়ে জঙ্গলের দিকে চলে গেল। আমি প্রথমটা থতমত খেয়ে গেলাম। তারপর ঘরের মধ্যে ঢুকে দেখি আমিনবাবু বিছানা হাতড়ে দেশলাই খুঁজছেন। উনি বললেন কুকুরটা দেখলে?
আমি বললাম কুকুর কই বাবু, একটা কে মেয়ে তো বার হয়ে গেল।
উনি বললেন উল্লুক, আমার সঙ্গে বেয়াদবি? মেয়েমানুষ কে আসবে এই জঙ্গলে দুপুররাতে? আমি কুকুরটার লেজ চেপে ধরেছিলাম, এমন কি তার লম্বা কান আমার গায়ে ঠেকেছে। মাচার নিচে ঢুকে কেঁউ কেঁউ করছিল। নেশা করতে শুরু করেছ বুঝি? রিপোর্ট করে দেব সদরে।
পরদিন রাত্রে আমি সজাগ হয়ে ছিলাম অনেক রাত পর্যন্ত। যেই একটু ঘুমিয়েছি অমনি আমিনবাবু ডাকলেন। আমি তাড়াতাড়ি ছুটে বেরিয়ে আমার ঘরের দোর পর্যন্ত গিয়েছি, এমন সময় দেখি একটি মেয়ে ওঁর ঘরের উত্তর দিকের বেড়ার গা বেয়ে জঙ্গলের দিকে যাচ্ছে। তখনই হুজুর আমি নিজে জঙ্গলের মধ্যে ঢুকলাম। অতটুকু সময়ের মধ্যে লুকোবে কোথায়, যাবেই বা কত দূর? বিশেষ করে আমরা জঙ্গল জরিপ করি, অন্ধি-সন্ধি সব আমাদের জানা। কত খুঁজলাম বাবু, কোথাও তার চিহ্নটি পাওয়া গেল না। শেষে আমার কেমন সন্দেহ হোলো, মাটিতে আলো ধরে দেখি কোথাও পায়ের দাগ নেই, আমার নাগরা জুতোর দাগ ছাড়া।
আমিনবাবুকে আমি একথা বললাম না আর সেদিন। একা দুটি প্রাণী থাকি এই ভীষণ জঙ্গলের মধ্যে হুজুর। ভয়ে আমার গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠল। আর বোমাইবুরু জঙ্গলের একটু দুর্নামও শোনা ছিল। ঠাকুরদাদার মুখে শুনেছি, বোমাইবুরু পাহাড়ের উপর ওই যে বটগাছটা দেখছেন দূরে-একবার তিনি পূর্ণিয়া থেকে কলাই বিক্রির টাকা নিয়ে জ্যোৎস্নারাত্রে ঘোড়ায় করে জঙ্গলের পথে ফিরছিলেন; ওই বটতলায় এসে দেখেন একদল অল্পবয়সী সুন্দরী মেয়ে হাত-ধরাধরি করে জ্যোৎস্নার মধ্যে নাচছে। এদেশে বলে ওদের ডামাবাণু’-এক ধরনের জিনপরী, নির্জন জঙ্গলের মধ্যে থাকে। মানুষকে বেঘোরে পেলে মেরেও ফেলে।
হুজুর, পরদিন রাত্রে আমি নিজে আমিনবাবুর তাঁবুতে শুয়ে জেগে রইলাম সারারাত। সারারাত জেগে জরিপের থাকবন্দির হিসেব কষতে লাগলাম। বোধ হয় শেষ রাতের দিকে একটু তন্দ্রা এসে থাকবে হঠাৎ কাছেই একটা কিসের শব্দ শুনে মুখ তুলে চাইলাম দেখি আমিন সাহেব ঘুমুচ্ছেন ওঁর খাটে, আর খাটের নিচে কি-একটা ঢুকেছে। মাথা নিচু করে খাটের নিচে দেখতে গিয়েই চমকে উঠলাম। আধ-আলো আধ-অন্ধকারে প্রথমটা মনে হোলো একটি মেয়ে যেন গুটিসুটি মেরে খাটের তলায় বসে আমার দিকে হাসিমুখে চেয়ে আছে স্পষ্ট দেখলাম হুজুর, আপনার পায়ে হাত দিয়ে বলতে পারি। এমন কি, তার মাথায় বেশ কালো চুলের গোছা পর্যন্ত স্পষ্ট দেখেছি। লণ্ঠনটা ছিল যেখানটাতে বসে হিসেব কষছিলাম সেখানে-হাত ছ-সাত দূরে। আরো ভালো করে দেখব বলে লণ্ঠনটা যেমন আনতে গিয়েছি, কি একটা প্রাণী ছুটে খাটের তলা থেকে বেরিয়ে পালাতে গেলদোরের কাছে লণ্ঠনের আলোটা বাঁকা ভাবে পড়েছিল, সেই আলোতে দেখলাম একটা বড় কুকুর, কিন্তু তার আগাগোড়া সাদা, হুজুর, কালোর চিহ্ন কোথাও নেই তার গায়ে।
আমিন সাহেব জেগে বললেন কি, কি? বললাম ও কিছু নয়, একটা শেয়াল কি কুকুর ঘরে ঢুকেছিল। আমিন সাহেব বললেন-কুকুর? কি রকম কুকুর? বললাম-সাদা কুকুর। আমিন সাহেব যেন একটা নিরাশার সুরে বললেন-সাদা ঠিক দেখেছ? না কালো? বললাম-না, সাদাই হুজুর।
আমি একটু বিস্মিত যে না হয়েছিলাম এমন নয়-সাদা না হয়ে কালো হলেই বা আমিনবাবুর কি সুবিধা হবে তাতে বুঝলাম না। উনি ঘুমিয়ে পড়লেন। কিন্তু আমার যে কেমন একটা ভয় ও অস্বস্তি বোধ হোলো কিছুতেই চোখের পাতা বোজাতে পারলাম না। খুব সকালে উঠে খাটের নিচেটা একবার কি মনে করে ভালো করে খুঁজতে গিয়ে সেখানে একগাছা কালো চুল পেলাম। এই সে চুলও রেখেছি, হুজুর। মেয়েমানুষের মাথার চুল। কোথা থেকে এল এ চুল? দিব্যি কালো কুচকুচে নরম চুল। কুকুর-বিশেষত সাদা কুকুরের গায়ে এত বড়, নরম কালো চুল হয় না। এ হোলো গত রবিবার অর্থাৎ আজ তিন দিনের কথা। এই তিন দিন থেকে আমিন সাহেব তো এক রকম উন্মাদ হয়েই উঠেছেন। আমার ভয় করছে হুজুর। এবার আমার পালা কিনা তাই ভাবছি।
গল্পটা বেশ আষাঢ়ে-গোছের বটে। সে চুলগাছি হাতে করিয়া দেখিয়াও কিছু বুঝিতে পারিলাম না। মেয়েমানুষের মাথার চুল, সে-বিষয়ে আমারও কোনো সন্দেহ রহিল না। আসরফি টিণ্ডেল ছোকরা মানুষ, সে যে নেশা-ভাঙ করে না, একথা সকলেই একবাক্যে বলিল। জনমানবশূন্য প্রান্তর ও বনঝোপের মধ্যে একমাত্র তাঁবু এই আমিনের নিকটতম লোকালয় হইতেছে লবটুলিয়া। ছয় মাইল দূরে। মেয়েমানুষই বা কোথা হইতে আসিতে পারে অত গভীর রাত্রে-বিশেষ যখন এইসব নির্জন বনপ্রান্তরে বাঘ ও বুনোশুয়োরের ভয়ে সন্ধ্যার পরে আর লোকে পথ চলে না!
যদি আসরফি টিণ্ডেলের কথা সত্য বলিয়া ধরিয়া লই, তবে ব্যাপারটা খুব রহস্যময়। অথবা এই পাণ্ডববর্জিত দেশে, এই জনহীন বনজঙ্গল ও ধূ-ধূ প্রান্তরের মধ্যে বিংশ শতাব্দী তো প্রবেশের পথ খুঁজিয়া পায়ই নাই-ঊনবিংশ শতাব্দীও পাইয়াছে বলিয়া মনে হয় না। অতীত যুগের রহস্যময় অন্ধকারে এখনো এসব অঞ্চল আচ্ছন্ন এখানে সবই সম্ভব।
সেখানকার তাঁবু উঠাইয়া রামচন্দ্র আমিন ও আসরফি টিণ্ডেলকে সদর কাছারিতে লইয়া আসিলাম। রামচন্দ্রের অবস্থা দিন দিন খারাপ হইতে লাগিল, ক্রমশ সে ঘোর উন্মাদ হইয়া উঠিল। সারারাত্রি চিৎকার করে, বকে, গান গায়। ডাক্তার আনিয়া দেখাইলাম, কিছুতেই কিছু হইল না, অবশেষে তাহার এক দাদা আসিয়া তাহাকে লইয়া গেল।
এই ঘটনার একটা উপসংহার আছে, যদিও তাহা ঘটিয়াছিল বর্তমান ঘটনার সাত-আট মাস পরে, তবুও এখানেই তাহা বলিয়া রাখি। এ ঘটনার ছ-মাস পরে চৈত্র মাসের দিকে দুটি লোক কাছারিতে আমার সঙ্গে দেখা করিল। একজন বৃদ্ধ, বয়স ষাট-পঁয়ষট্টির কম নয়, অন্যটি তার ছেলে, বয়স কুড়ি-বাইশ। তাদের বাড়ি বালিয়া জেলায়, আমাদের এখানে আসিয়াছে চরি-মহাল ইজারা লইতে অর্থাৎ আমাদের জঙ্গলে খাজনা দিয়া তাহারা গোরু-মহিষ চরাইবে।
অন্য সব চরি-মহাল তখন বিলি হইয়া গিয়াছে, বোমাইবুরুর জঙ্গলটা তখনো খালি পড়িয়া ছিল, সেইটাই বন্দোবস্ত করিয়া দিলাম। বৃদ্ধ ছেলেকে সঙ্গে লইয়া একদিন মহাল দেখিয়াও আসিল। খুব খুশি, বলিল, খুব বড় বড় ঘাস হুজুর, বহুৎ আচ্ছা জঙ্গল। হুজুরের মেহেরবানি না হলে অমন জঙ্গল মিলত না।
রামচন্দ্র ও আসরফি টিণ্ডেলের কথা তখন আমার মনে ছিল না, থাকিলেও বৃদ্ধের নিকট তাহা হয়তো বলিতাম না। কারণ, ভয় পাইয়া সে ভাগিয়া গেলে জমিদারের লোকসান। স্থানীয় লোকেরা কেহই ও জঙ্গল ইজারা লইতে ঘেঁষে না, রামচন্দ্র আমিনের সেই ব্যাপারের পরে।
মাসখানেক পরে বৈশাখের গোড়ায় একদিন বৃদ্ধ লোকটি কাছারিতে আসিয়া হাজির, মহা রাগত ভাব, তার পিছনে সেই ছেলেটি কাঁচুমাচু ভাবে দাঁড়াইয়া।
বলিলাম-কি ব্যাপার?
বৃদ্ধ রাগে কাঁপিতে কাঁপিতে বলিল এই বাঁদরটাকে নিয়ে এলাম হুজুরের কাছে দরবার করতে। ওকে আপনি পা থেকে খুলে পঁচিশ জুতো মারুন, ও জব্দ হয়ে যাক্।
-কি, হয়েছে কি?
-হুজুরের কাছে বলতে লজ্জা করে। এই বাঁদর, এখানে এসে পর্যন্ত বিগড়ে যাচ্ছে। আমি সাত-আট দিন প্রায়ই লক্ষ্য করছ লজ্জা করে বলতে হুজুর প্রায়ই মেয়েমানুষ ঘর থেকে বার হয়ে যায়। একটা মাত্র খুপরি হাত-আষ্টেক লম্বা, ঘাসে ছাওয়া, ও আর আমি দু-জনে শুই। আমার চোখে ধুলো দিতে পারাও সোজা কথা নয়। দু-দিন যখন দেখলাম তখন ওকে জিজ্ঞেস করলাম, ও একেবারে গাছ থেকে পড়ল হুজুর। বলে-কই, আমি তো কিছুই জানি নে! আরো দু-দিন যখন দেখলাম, তখন একদিন দিলাম আচ্ছা করে ওকে মার। চোখের সামনে বিগড়ে যাবে ছেলে? কিন্তু তার পরেও যখন দেখলাম, এই পরশু রাত্রেই হুজুর তখন ওকে আমি হুজুরের দরবারে নিয়ে এসেছি, হুজুর শাসন করে দিন।
হঠাৎ রামচন্দ্র আমিনের ব্যাপারটা মনে পড়িয়া গেল। জিজ্ঞাসা করিলাম-কত রাত্রে দেখেছ?
-প্রায়ই শেষরাত্রের দিকে হুজুর। এই রাতের দু-এক ঘড়ি বাকি থাকতে।
-ঠিক দেখেছ, মেয়েমানুষ?
-হুজুর, আমার চোখের তেজ এখনো তত কম হয় নি। জরুর মেয়েমানুষ, বয়সেও কম, কোনোদিন পরনে সাদা ধোয়া শাড়ি, কোনোদিন বা লাল, কোনোদিন কালো। একদিন মেয়েমানুষটা বেরিয়ে যেতেই আমি পেছন পেছন গেলাম। কাশের জঙ্গলের মধ্যে কোথায় পালিয়ে গেল, টের পেলাম না। ফিরে এসে দেখি, ছেলে আমার যেন খুব ঘুমের ভান করে পড়ে রয়েছে, ডাকতেই ধড়মড় করে ঠেলে উঠল, যেন সদ্য ঘুম ভেঙে উঠল। এ রোগের ওষুধ কাছারি ভিন্ন হবে না বুঝলাম, তাই হুজুরের কাছে…।
ছেলেটিকে আড়ালে লইয়া গিয়া জিজ্ঞাসা করিলাম এ সব কি শুনছি তোমার নামে?
ছেলেটি আমার পা জড়াইয়া ধরিয়া বলিল আমার কথা বিশ্বাস করুন হুজুর। আমি এর বিন্দুবিসর্গ জানি না। সমস্ত দিন জঙ্গলে মহিষ চরিয়ে বেড়াই-রাতে মড়ার মতো ঘুমুই, ভোর হলে তবে ঘুম ভাঙে। ঘরে আগুন লাগলেও আমার হুঁশ থাকে না।
বলিলাম তুমি কোনোদিন কিছু ঘরে ঢুকতে দেখ নি?
-না, হুজুর। আমার ঘুমুলে হুঁশ থাকে না।
এ-বিষয়ে আর কোনো কথা হইল না। বৃদ্ধ খুব খুশি হইল, ভাবিল আমি আড়ালে লইয়া গিয়া ছেলেকে খুব শাসন করিয়া দিয়াছি। দিন-পনের পরে একদিন ছেলেটি আমার কাছে আসিল। বলিল-হুজুর, একটা কথা আছে। সেবার যখন আমি বাবার সঙ্গে কাছারিতে এসেছিলাম, তখন আপনি ও-কথা জিজ্ঞেস করেছিলেন কেন যে আমি কোনো কিছু ঘরে ঢুকতে দেখেছি কি না?
-কেন বল তো?
-হুজুর, আমার ঘুম আজকাল খুব সজাগ হয়েছে বাবা ওই রকম করেন বলে আমার মনে কেমন একটা ভয়ের দরুনই হোক বা যার দরুনই হোক। তাই ক-দিন থেকে দেখছি, রাত্রে একটা সাদা কুকুর কোথা থেকে আসে অনেক রাত্রে আসে, ঘুম ভেঙে এক-একদিন দেখি সেটা বিছানার কাছেই কোথায় ছিল আমি জেগে শব্দ করতেই পালিয়ে যায় কোনো দিন জেগে উঠলেই পালায়। সে কেমন বুঝতে পারে যে, এইবার আমি জেগেছি। এ রকম তো ক-দিন দেখলাম কিন্তু কাল রাতে হুজুর, একটা ব্যাপার ঘটেছে। বাপজী জানে না আপনাকে চুপি চুপি বলতে এলাম। কাল অনেক রাতে ঘুম ভেঙে দেখি, কুকুরটা ঘরে কখন ঢুকেছিল দেখি নি আস্তে আস্তে ঘর থেকে বার হয়ে যাচ্ছে। সেদিকের কাশের বেড়ায় জানালার মাপে কাটা ফাঁক। কুকুর বেরিয়ে যাওয়ার পরে বোধ হয় পলক ফেলতে যতটা দেরি হয়, তার পরেই আমার সামনের জানালা দিয়ে দেখি একটি মেয়েমানুষ জানালার পাশ দিয়ে ঘরের পিছনের জঙ্গলের দিকে চলে গেল। আমি তখুনি বাইরে ছুটে গেলাম কোথাও কিছু না। বাবাকেও জানাই নি, বুড়োমানুষ ঘুমুচ্ছে। ব্যাপারটা কি হুজুর বুঝতে পারছি নে।
আমি তাহাকে আশ্বাস দিলাম ও কিছু নয়, চোখের ভুল। বলিলাম যদি তাহাদের ওখানে থাকিতে ভয় করে, তাহারা কাছারিতে আসিয়া শুইতে পারে। ছেলেটি নিজের সাহসহীনতায় বোধ করি কিঞ্চিৎ লজ্জিত হইয়া চলিয়া গেল। কিন্তু আমার অস্বস্তি দূর হইল না, ভাবিলাম এইবার কিছু শুনিলে কাছারি হইতে দুইজন সিপাহী পাঠাইব রাত্রে ওদের কাছে শুইবার জন্য।
তখনো বুঝিতে পারি নাই জিনিসটা কত সঙ্গীন। দুর্ঘটনা ঘটিয়া গেল অতি অকস্মাৎ এবং অতি অপ্রত্যাশিত ভাবে।
দিন-তিনেক পরে।
সকালে সবে বিছানা ছাড়িয়া উঠিয়াছি, খবর পাইলাম কাল রাত্রে বোমাইবুরু জঙ্গলে বৃদ্ধ ইজারাদারের ছেলেটি মারা গিয়াছে। ঘোড়ায় চড়িয়া আমরা তখনই রওনা হইলাম। গিয়া দেখি তাহারা যে ঘরটাতে থাকিত তাহারই পিছনে কাশ ও বনঝাউ-জঙ্গলে ছেলেটির মৃতদেহ তখনো পড়িয়া আছে। মুখে তাহার ভীষণ ভয় ও আতঙ্কের চিহ্ন কি একটা বিভীষিকা দেখিয়া আঁৎকাইয়া যেন মারা গিয়াছে। বৃদ্ধের মুখে শুনিলাম, শেষ রাত্রির দিকে উঠিয়া ছেলেকে সে বিছানায় না দেখিয়া তখনই লণ্ঠন ধরিয়া খোঁজাখুঁজি আরম্ভ করে কিন্তু ভোরের পূর্বে তাহার মৃতদেহ দেখিতে পাওয়া যায় নাই। মনে হয়, সে হঠাৎ বিছানা হইতে উঠিয়া কোনো-কিছুর অনুসরণ করিয়া বনের মধ্যে ঢোকে-কারণ, মৃতদেহের কাছেই একটা মোটা লাঠি ও লণ্ঠন পড়িয়া ছিল, কিসের অনুসরণ করিয়া সে বনের মধ্যে রাত্রে একা আসিয়াছিল তাহা বলা শক্ত। কারণ, নরম বালিমাটির উপরে ছেলেটির পায়ের দাগ ছাড়া অন্য কোনো পায়ের দাগ নাই-না মানুষ, না জানোয়ারের। মৃতদেহেও কোনোরূপ আঘাতের চিহ্ন ছিল না।
বোমাইবুরু জঙ্গলের এই রহস্যময় ব্যাপারের কোনো মীমাংসাই হয় নাই, পুলিস আসিয়া কিছু করিতে না-পারিয়া ফিরিয়া গেল, লোকজনের মনে এমন একটা আতঙ্কের সৃষ্টি করিল ঘটনাটি যে, সন্ধ্যার বহু পূর্ব হইতে ও অঞ্চলে আর কেহ যায় না। দিনকতক তো এমন হইল যে, কাছারিতে একলা নিজের ঘরটিতে শুইয়া বাহিরের ধপধপে সাদা, ছায়াহীন উদাস, নির্জন জ্যোৎস্নারাত্রির দিকে চাহিয়া কেমন একটা অজানা আতঙ্কে প্রাণ কাঁপিয়া উঠিত, মনে হইত কলিকাতায় পালাই, এসব জায়গা ভালো নয়, এর জ্যোৎস্নাভরা নৈশপ্রকৃতি রূপকথার রাক্ষসী রানীর মতো, তোমাকে ভুলাইয়া বেঘোরে লইয়া গিয়া মারিয়া ফেলিবে। যেন এসব স্থান মানুষের বাসভূমি নয় বটে, কিন্তু ভিন্নলোকের রহস্যময়, অশরীরী প্রাণীদের রাজ্য, বহুকাল ধরিয়া তাহারাই বসবাস করিয়া আসিতেছিল, আজ হঠাৎ তাদের সেই গোপন রাজ্যে মানুষের অনধিকার প্রবেশ তাহারা পছন্দ করে নাই, সুযোগ পাইলেই প্রতিহিংসা লইতে ছাড়িবে না।

আপলোড: 8/8/2017

ছেলেবেলার ভাললাগা গল্প: আরক (বিভুতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়)





6/8/2017

ভয় রহস্য গল্প (For Mobile & PC): মাইছা দেউ










প্রথম প্রকাশ: ‘কিশোর ভারতী’ ১৪২৩ বৈশাখী স্পেশাল সংখ্যায়
আপলোড: ২৬/৭/২০১৭ 

গল্প (মোবাইল ভার্শন): দুই ঠকের গল্প

দুই ঠকের গল্প
শিশির বিশ্বাস
ঠক হল যারা লোক ঠকিয়ে খায় অর্থাৎ প্রতারকঠক আজও যেমন রয়েছে সেকালেও ছিল। আর ছিল তাদের নিয়ে নানা গল্প। এগল্পটা শুনেছিলাম আমার দাদুর কাছে। চমৎকার গল্প বলতে পারতেন তিনি। অনেক পরে একটি ওড়িয়া লোককথার সঙ্গে গল্পটির কিছু মিল খুঁজে পেয়েছিলাম। তবে সবটা নয়। তাই মনে হয় দাদু তাঁর বেশিরভাগ গল্পের মতো এটিও নিজের মতো করে গড়ে নিয়েছিলেন। যাই হোক এবার গল্পটা শোনো।
গোবরচাঁদ আর গণেশচাঁদ দুই ঠকনাম আর পেশায় মিল থাকলেও গোড়ায় অবশ্য চেনা–পরিচয় ছিল নাসেটা একরকম হঠাৎ বলা যায়সে এক হাটের দিন। রোজগারের ধান্দায় খালের পাড় ধরে গোবরচাঁদ চলেছে সেই দিকে। মাথায় বস্তা ভরতি হাবিজাবি গাছের ছাল। ওদিকে গণেশচাঁদও চলেছে সেই হাটের দিকে খালের অন্য পাড় ধরে। তারও মাথায় মস্ত এক বস্তা। তাতে ভরতি উনুনের ছাই।
চড়া রোদে দুই ঠক হাঁটছে আর আড়চোখে অন্যের দিকে তাকাচ্ছে। মনে মনে ভাবছে কীভাবে অন্যজনকে ঠকাবে। একসময় গণেশচাঁদ খালের ওপারে গোবরচাঁদকে উদ্দেশ্য করে বললকত্তা হাটে যাচ্ছ বুঝি। তা বস্তায় কী?’
আমার বস্তায় বাপু বাজারের সেরা মানের দারচিনি। গন্ধ পাচ্ছ না?’ বলতে বলতে গোবরচাঁদ বড় একটা সুগন্ধি নিঃশ্বাস টানল। তা তোমার বস্তায় কী বাপু?’
আমার বস্তায়?’ গণেশচাঁদ দেমাক করে বললআমার বস্তায় বাপু চালের গুঁড়ো। সরেস গোবিন্দভোগ। হাটে বেচতে যাচ্ছি।
তা এক কাজ করো না বাপু।গোবরচাঁদ জুলজুল করে খালের ওপার থেকে তাকাল। হাট তো এখনো মেলা দূর। এই রোদে অত পথ ভাঙার দরকার কী? যদি রাজি থাকো তো আমার দারচিনির বস্তার বদলে তোমার চালের গুঁড়োর বস্তা বদলে নিতে পারো। কেনাবেচার কাজ এখানেই সেরে ফেলা যায়। হাটে আর কষ্ট করে যেতে হয় না।
গণেশচাঁদও তো তাই চায়। মাথার বস্তায় তো উনুনের ছাই। তার বদলে এক বস্তা দারচিনি মানে অনেক টাকার জিনিস। খালে জল বেশি নয়। বস্তা মাথায় জল পার হয়ে সে সোজা এপারে এসে হাজির। বস্তা বদল হতে দুজনের কেউই এরপর আর দেরি করেনি। ফের যদি অন্য পক্ষের মত পালটে যায় সেই ভয়ে যে যার বাড়ির দিকে দৌড়।
গোবরচাঁদ বাড়িতে এসে মাথার বস্তা নামিয়ে হাঁক পাড়লগিন্নি আজ বেজায় দাঁও মেরে দিইছি। সেই গাছের ছালের বদলে এক বস্তা চালের গুঁড়ো বাগিয়ে এনেছি। কদিন ধরে সমানে পিঠের বায়না হচ্ছিল ছেলেপুলে নিয়ে কত খাবে খাও এবার।
ওদিকে অন্য ঠক গণেশচাঁদ বাড়িতে বউয়ের সামনে বস্তা নামিয়ে হেসে বাঁচে না। বেচারা নতুন বিয়ে করেছে। বলল বউ আর ভাবনা নেই। তোমার জন্য নতুন গয়নার ব্যবস্থা করে ফেলেছি এবার। মেলা টাকার দাঁও মেরেছি আজ। সেই ছাইয়ে বদলে এক বস্তা দারচিনি!
বলা বাহুল্য, বউদের মুখনাড়ায় দুজনের মুখ চুন হতে দেরি হয়নি এরপর।
কদিন পরে চলতি পথে দুই ঠক ফের মুখোমুখি। দেখা হতেই দুজন কেঁদে ফেলল ভেউভেউ করে।
ভাইরে নতুন বউয়ের কাছে এমন বেইজ্জতি! মান রাখা দায় হয়েছে।
ভাইরে আমারও সেই অবস্থা। একটা কিছু না করলে বউছেলেপুলের কাছে আর মুখ দেখানো যাচ্ছে না
‘তাই বলি কী’ গোবরচাঁদ বললএবার থেকে দুজন মিলে ঠকের কারবার শুরু করি। তাতে আখেরে দুজনেরই লাভ হবে
গণেশচাঁদ তো মুহূর্তে রাজি। হাত বাড়িয়ে দিয়ে বললতাহলে কারবার আজ থেকেই শুরু করা যাক।
সেদিনও হাটবার। মতলব এঁটে দুই ঠক হাজির হল এক কামারশালায়। ফরমায়েশ দিয়ে জুতসই একটা লোহার কড়া তৈরি করাল। সঙ্গে নিল একটা ক্যানেস্তারাও। বিকেলে হাট তখন জমে উঠেছে। ঢাঁই–ঢাঁই শব্দে বিকট আওয়াজে ক্যানেস্তারা পেটাতে পেটাতে দুই ঠক হইহই করে সেই হাটের মাঝে।
মহারাজা ঢ্যাঁড়া দিয়েছেন। শোন গো সবাই। এক জরুরি ঘোষণা
রাজ্যে মহারাজার বেজায় প্রতাপ। যেমন রগচটা তেমন মেজাজি মানুষ। তাঁর নাম শুনে হাটের সবাই তো থমকে দাঁড়িয়ে পড়েছে। কী ঘোষণা ভাই?
মহারাজ আগামী হপ্তায় যুদ্ধে বের হবেন। আমাদের পাঠিয়েছেন সেপাই জোগাড়ের জন্য।গুরুগম্ভীর স্বরে জানান দিয়ে গণেশচাঁদ কোঁচড় থেকে এরপর সেই লোহার কড়া বের করল। এই কড়া যায় হাতে মানানসই হবে। মহারাজার হুকুমে তাকে পলটনে নাম লেখাতে হবে।
গণেশচাঁদের মুখের কথা খসতে না খসতেই হাট প্রায় সাফ। মুহূর্তে যে যেদিকে পারে দৌড়। গ্রামের হাট। সবাই ছাপোষা মানুষ। বউছেলেপুলে নিয়ে সংসার। কে যুদ্ধে গিয়ে বেঘোরে প্রাণ খোয়াতে চায়? কিন্তু দুই ঠক ছাড়বে কেন? ছুটে গিয়ে পাকড়াল এক ধানচালের ব্যাপারীকে। বেচারা মালপত্র ফেলে পালাতে পারেনি। গণেশচাঁদ নিমেষে সেই কড়া পরিয়ে ফেলল তার হাতে।
বাহ্! এই তো দারুণ মানানসই হয়েছে! শরীলে তাকত আছে দেখছি। এমন লোকই মহারাজের পলটনে দরকার।গণেশচাঁদ দাবড়ে উঠলতা এবার নামঠিকানা বলে ফেল দেখি পলটনের লিস্টিতে দেগে নেই। খবর্দার মিছে কতা কইবিনি। মহারাজের হুকুমে গর্দান যাবে।বলতে বলতে পকেটে হাত দিল সে।
গোবরচাঁদ ইতিমধ্যে তাকে পিছন থেকে চেপে ধরেছেপালাবার উপায় নেই। লোকটা হাউমাউ করে উঠলনা রে ভাই দেখতেই এমন আসলে কলজেয় রক্ত নেই মোটে। বেবাক জল। ঘরের বউই দুবেলা পেটায়। গায়ে এক রত্তি শক্তি নেই
মিছে কতা কওয়ার জায়গা পাওনি?’ ধমকে উঠল গণেশচাঁদ। দিব্যি তো পাল্লা ভরতি ধান মাপতেছিলে! এক একবারে বিশ সের। দেখিনি ভেবেছ?’
 অগত্যা উপায় নেই দেখে লোকটা এবার অন্য পথ ধরল। ব্যবসায়ী মানুষ। কোন দেবতা কিসে তুষ্ট ভালই জানে। প্রাণের দায়ে কোমরের গেঁজে থেকে এক খাবলা চকচকে টাকা বের করে বললদাদা গো আমি নেহাত চালের ব্যাপারী। ঢালসড়কি জন্মে ধরিনিবরং কিছু ধরে দিচ্ছি নিয়ে ক্ষ্যামা দেন।
শিকার যখন লাইনে এসে গেছে দুই ঠক আর দেরি করল না। ছোঁ মেরে টাকাগুলো হাতিয়ে নিয়ে ছুটল আর একজনকে পাকড়াতেহাটের অন্য ব্যাপারীরাও ইতিমধ্যে একে একে মালপত্র গুছিয়ে ফর্সা হতে শুরু করেছে। সময় নষ্ট করা যায় না।
সন্ধের আগেই দুই ঠগের ট্যাঁক বোঝাইরাতে ঘরে ফিরতে ওদের বউরাও আহ্লাদে আটখানা। এমন স্বামীর জয়গান করেও সুখ।
দিন কয়েক পরে দুই ঠক ফের ধান্দায় বের হয়েছে। ঘুরতে ঘুরতে এসে হাজির দূরের এক গ্রামে। খোঁজ পেয়েছে সেখানে এক বুড়ির মেলা টাকাপয়সা সোনাদানানিজের মানুষ বলতে তিন কূলে দূর সম্পর্কের এক নাতি। সে কখনো এসে দেখে যায়। একাই থাকে বুড়ি। খবরটা শুনেই দুই ঠক মতলব করে বুড়ির বাড়ি এসে পায়ের কাছে আছড়ে পড়ল। পিসি গো এমন হাল হয়েছে তোমার! হায় হায়!
থতমত খেয়ে বুড়ি তো হাঁ করে তাকিয়ে আছে। গণেশচাঁদ হাতপা নেড়ে ব্যক্ত করলপিসি গো আমরা হলাম তোমার আপন মামাতো ভাইয়ের দুই পুত্তুর। বাবার কাছে তোমার কথা কত শুনেছি। তাই তো খুঁজতে খুঁজতে চলেবলতে বলতে গলা ধরে এল তার। কথা শেষ না করে কাপড়ের খুঁটে চোখ মুছতে লাগল।
দেখে গোবরচাঁদ এবার পোঁ ধরলপিসি গো কোলে করে কত আমের আচার খাইয়েছ তুমি। শীতকালে পিঠে পায়েস। মুখে লেগে আছে এখনো। মনে নেই তোমার?’
সব সব মনে আছে রে বাছা। মনে আছে।পুরোনো কথা ভেবে বুড়ি হাতপা ছড়িয়ে কাঁদতে বসল এবার। তারপর চোখের জল মুছে বললতোরা অত দূর থেকে পিসির খোঁজ নিতে এয়েছিস চাট্টি খেয়ে জিরিয়ে নে আগেআমি ভাত চাপিয়ে দিচ্ছি
কেল্লা প্রায় ফতে। গণেশচাঁদ বললপিসি গো আসল কথাই তো বলিনি। সামনের হপ্তায় ছেলের বিয়ে ঠিক হয়েছে। এবার তোমার খোঁজ যখন পেয়েছি আশীর্বাদের দিন যেতেই হবে। নয়তো ছেলের বিয়েই দেব না।
সে হবে বাবারা।বেজায় খুশি হয়ে বুড়ি বললদূর থেকে এসেছিল তেল দিচ্ছি চানটা সেরে আয় এবার।বুড়ি এরপর সিন্দুক খুলে চমৎকার এক সোনার তেলের বাটি বের করে ওদের হাতে দিয়ে পুকুর থেকে চান করে আসতে বলল। দুজন সেই তেলের বাটি নিয়ে ছুটল পুকুরের দিকে। তারপর চান সেরে ফিরে এসে হাউমাউ চিৎকার। ‘গিসি গো ঘাটে তেলের বাটি রেখে সবে জলে নেমেছি এক বজ্জাত কাক এসে বাটিটা নিয়ে উড়ে গেল। ভিজে কাপড়ে দুজন ছুটে ছুটে হয়রান। কিন্তু হদিশ পেলাম না। কী লজ্জার কথা বলো দেখি! খেতে বসার মুখ নেই আর। হায়—হায়!’
আসলে সবটাই মিছে কথা। অমন সোনার বাটি দেখে দুইজন আর লোভ সামলাতে পারেনি। পকেটে ভরে ফেলেছে।
ভেবেছিল বুড়ি হয়তো দু’কথা শোনাবেকিন্তু বুড়ি তার ধার দিয়েই গেল না। বরং সান্ত্বনা দিয়ে বলললজ্জা পাসনি বাছারা। পোড়া কপাল আমারই নইলে শুভ কাজের শুরুতেই এমন হবে কেন? তা ভাবিসনি বাছারা। আজই আমার নাতিকে খবর পাঠাচ্ছি। আমার বদলে সেই গিয়ে আশীর্বাদ করে আসবে।
বুড়ির নাতি প্রায় ওদেরই বয়েসি। খবর পেয়ে পরের দিন এসে পৌঁছুতে বুড়ি সিন্দুক খুলে হীরে মণিমুক্তো বসানো একছড়া হার বের করল। তারপর নাতির হাতে দিয়ে বললআমার হয়ে তুই আশীর্বাদ করে আয়।
বুড়ির নাতি তেজি এক ঘোড়া নিয়ে এসেছিল। তার পিঠে চেপে তিনজন রওনা হয়ে পড়ল। অনেক পথ পার হয়ে ঘোড়া এক ভিন গ্রামের পথ ধরেছে দুই ঠক কাঁচুমাচু হয়ে বললদাদাভাই বেজায় খিদে পেয়েছে গো। এদিকে পকেটে কানাকড়ি নেই। ওই হারছড়া থেকে একটু সোনা যদি দাও কিছু পেটে দিয়ে প্রাণ বাঁচাই।
আরে সেজন্য সোনার গয়নার দরকার কি?’ বুড়ির নাতি হাসল ওদের কথায়। এদিকে সবাই আমার চেনা। বললেই ধারে মাল দেবে।
কথা শেষ করে একটু পরেই সে পথের পাশে এক সরাইখানার সামনে ঘোড়া দাঁড় করিয়ে ওদের দিকে তাকাল। তবে একটা কথা ভাই। মালিক হয়তো জানতে চাইবে এক না দুই। তা দুজন যখন খাবে জানিয়ে দেবে দুই। ঠিক আছে?’
পথের ধারে মস্ত সরাইখানা। সামনে খাওয়ার ঘর খদ্দেরের ভিড়ে সরগরমসবাই গবগব করে খাবার সাঁটাচ্ছে। জনা কয়েক কর্মচারী তাদের সামাল দিতে হিমসিম। সেদিকে তাকিয়ে সুড়ুত করে জিবের জল টেনে দুই ঠক ঘাড় নাড়ল।
বুড়ির নাতি এরপর ওদের অপেক্ষা করতে বলে সোজা সরাইখানার মালিকের ঘরে ঢুকে কানে কানে বললগুরু তোমার সরাইখানায় ব্যাগার খাটার জন্য দুজন জবরদস্ত কাজের মানুষ ধরে এনেছি আজ।
মালিক বাইরে দুই ঠকের দিকে এক পলক চোখ বুলিয়ে নিয়ে অল্প ঘাড় নাড়ল। হুম মন্দ নয় দেখছি। তবে এক বছর ব্যাগারের জন্য কিন্তু বেশি দাম দিতে পারব না।
না গুরুবুড়ির নাতি ফিসফিস করে বললওরা দুই বছরের জন্য ব্যাগার দিতে রাজি হয়েছে। বিশ্বাস না হয় নিজে গিয়ে শুধিয়ে দেখ।
সরাইখানার মালিক এরপর ওদের কাছে এসে বললএক না দুই?’
দুই ঠক তৎক্ষণাৎ মাথা নেড়ে বললদুই দুই।
খুশি হয়ে মালিক এরপর ওদের ভিতরে বসিয়ে ছুটল বুড়ির নাতির কাছে। ঝনঝন করে মোহর গুনে নিয়ে বুড়ির নাতি এরপর এক ফাঁকে পগার পার।
ওদিকে দুই ঠক তো ভুরিভোজের অপেক্ষায় হাঁ করে বসে আছে। এমন সময় মালিক এসে বললসংয়ের মতো বসে না থেকে এবার কাজে লেগে পড় দেখি।
শুনে দুই ঠক তো প্রায় খাবি খাওয়ার জোগাড়। আকাশ থেকে পড়ে বলল কাজে লাগব মানে? দুজন সেই থেকে খাওয়ার জন্য বসে আছি!
শুনে হোটেলের সবাই তো হেসে খুনকথা শোনো দুই উজবুকের!
মালিক ষণ্ডা গোছের মেজাজি মানুষ। সামান্য কর্মচারীর বেয়দপি সহ্য করার পাত্র নয়। মুহূর্তে বিরাশী সিক্কার রদ্দা দুই ঠগের ঘাড়ে কশিয়ে দিয়ে বললহতভাগা দুই বছর ব্যাগার দেবার কড়ার করে এখন বায়নাক্কা! খাবার সেই রাত দুপুরে। এক সানকি ভাত। সময় নষ্ট না করে দুই চাঁদ এবার কাজে লাগ দেখি।
বুড়ির নাতি যে ওদের দুই বছরের জন্য সরাইখানায় বেচে দিয়ে গেছে দুই ঠকের মালুম হতে এরপর দেরি হয়নি। বুড়ি আর তার নাতি যে ওদের চাইতেও বড় ঠক ঘুণাক্ষরেও টের পায়নি কেউ কিন্তু তখন কপাল চাপড়ানো ছাড়া আর কিছুই যে করার নেই।
দুবছর ব্যাগার দেবার কথা। কিন্তু দুই মাসেই ওদের যা হাল হল তা কহতব্য নয়। দিনরাত্তির গাধার খাটুনি। পান থেকে চুন খসলেই ষণ্ডা মালিকের রদ্দা। খাবার বলতে সেই রাত দুপুরে এক সানকি ফেলাছড়া ভাত। তাও পেট ভরে নয়। দুমাসেই দুজন শুকিয়ে প্রায় আমসি হবার জোগাড়লম্বা চুলদাড়িতে তেলের অভাবে জট পড়তে শুরু করেছে। চেনাই মুশকিল। এর মধ্যেই ঘটল এক ব্যাপার। সেদিন দুজন খাবার ঘরের এঁটোকাঁটা সাফ করছে কোতোয়ালি থেকে উর্দিপরা এক পেয়াদা হঠাৎ সরাইখানার সামনে ঘোড়া থেকে নেমে মালিকের ঘরে গিয়ে ঢুকল। বাইরে থেকে তাদের কথার দু’এক টুকরো কানে আসতে দুই ঠকের তো প্রায় নাড়ি ছেড়ে যাবার জোগাড়।
কী ভয়ানক! সেই যে হাটে মহারাজার নাম করে দুইজন ঠকবাজি করে এসেছিল কীভাবে সেই কথা পৌঁছে গেছে মহারাজার কানে। খেপে গিয়ে দুই ঠককে ধরে আনার এতেলা পাঠিয়েছেন তিনি। খোদ মহারাজের আদেশ বলে কথা। পেয়াদা সেই খোঁজে এসেছে সরাইখানায়। ভাগ্যিস অনাহারে দুজনের চেহারা একে শুকিয়ে প্রায় কাঁকলাস তায় চুলদাড়ির জটলা। তাই পাশ দিয়ে গেলেও চিনতে পারেনি।
তারপর পেয়াদা বিদায় নিয়েছে এক সময়। ততক্ষণে খুশিতে দুই ঠকের প্রায় নবজন্ম। আনন্দে আটখানা। রাত একটু গভীর হতেই দুজন এরপর গটমটিয়ে মালিকের ঘরে। মালিক তখন খেরোর খাতায় দিনের হিসেব লিখছিল। মুখ তুলে তাকাতেই একজন বললহুজুর পেয়াদা যাদের খোঁজে এসেছিল আমরাই সেই দুইজন
অ্যাঁ!কেঁপে গিয়ে মালিকের হাতের কলম ছিটকে পড়ল খানিক দূরে।
আজ্ঞে হ্যাঁ হুজুর। পেয়াদার তাড়া খেয়ে পালিয়ে আপনার সরাইখানায় এসে উঠেছিলাম। তা দুই মাসে যে হাল করেছেন ভাবছি ধরাই দেব এবার। এই কষ্টের থেকে গর্দান যাওয়া ঢের ভাল। তবে ঠিক করেছি সেই সাথে আপনাকেও শূলে চড়াবার ব্যবস্থা পাকা করে যাব। তাতে মরেও শান্তি
ঠ—ঠকবাজি করেছিস তোরা। আমি শূলে চড়তে যাব কেন?’ বলতে গিয়ে মালিকের গলা কেঁপে গেল।
সব জেনেশুনেও আমাদের এখানে লুকিয়ে রেখেছেন তাই। মহারাজ যা মেজাজি মানুষ। সব শুনলে আপনিও কী আর ছাড় পাবেন?দুই ঠকের হাসি গাল ছাপিয়ে কান পর্যন্ত পৌঁছে গেল
নানা তা কেন!দুই ঠগের মুখের দিকে তাকিয়ে মালিক এবার প্রায় হাহাকার করে উঠল। তোরা বরং এক কাজ কর বাবা। দুটো ঘোড়ার ব্যবস্থা করে দিচ্ছি আজ রাতেই রাজ্য ছেড়ে পালা।
কিন্তু দুই বছরের মাইনেটাও যে মিটিয়ে দিতে হবে।
দ—দুবছর কী বলছিস বাবা! মাত্র তো দুমাস কাজ করেছিস
ফ্যাঁকড়ায় না পড়লে সেই দুই বছরই তো খাটাতে বাপ। এখন না হয় ফাঁদে পড়ে কাউমাউ।গণেশচাঁদ বললচল রে গোবরা তাহলে কোতোয়ালির দিকেই যাই।
তাই চল ভাই দুমাস ধরে যে হেনস্তা এক চিলতে বাঁচার ইচ্ছে নেই আরগোবরচাঁদ ব্যক্ত করল
না না।বেজায় ঘাবড়ে গিয়ে মালিক ওদের পায়ে উপর প্রায় হুমড়ি খেলে পড়ল।
তারপর? তারপর দুই বছরের মাইনে বাবদ দুই ঠক সরাইখানার মালিকের কাছ থেকে কুড়ি কুড়ি চল্লিশ মোহর বুঝে নিয়ে দুটো ঘোড়ায় সরাইখানা ছাড়ল সেই রাতেই। তারপর হরেক কৌশল খাটিয়ে দিন কয়েকের মধ্যে বউছেলে নিয়ে ভিন রাজ্যে। সেই সঙ্গে নাক–কান মুলে শপথ ঠকবাজি আর নয়। ঘটে বুদ্ধি যখন আছে সৎপথেও বেশ চালিয়ে নিতে পারবে।
ছবি: প্রকাশ গুপ্ত
প্রথম প্রকাশ: শারদীয়া ১৪২৩ ‘সঞ্চিতা’ পত্রিকা।
আপলোড: ২২/৭/২০১৭