Monday, 4 January 2016

ভৌতিক গল্প (মোবাইল ভার্শন): রুম নম্বর ১৩

অদ্ভুত এক ঘটনা আমার জীবনেও ঘটেছিল রে তার জেরে শুধু বন্ধুবিচ্ছেদ নয় ছাড়তে হয়েছিল চাকরিটাও
আজকের কাগজে এক ভৌতিক ঘটনার কথা ছাপা হয়েছে কথা হচ্ছিল তাই নিয়ে তার মধ্যেই বিনুমামা হঠাৎ বোমা ফাটালেন কারণ বিনুমামার গল্প মানেই স্রেফ দম বন্ধ করে শোনা ছাড়া অন্য পথ নেই
তাহলে কাগজের কথা থাক প্লিজ, তোমার ওই গল্পটাই বলকরুণ গলা পুপুলের
ছেলেবেলা থেকেই বিনুমামা ডানপিটে মানুষ অনেক অভিজ্ঞতা সেই গল্প আগে একটা শুনিয়েছি কিন্তু ব্যস্ত মানুষটির দেখা পাওয়াই মুশকিল কলকাতায় জরুরি কাজ থাকলে কখনও রাতটা কাটিয়ে চলে যান পরের দিনই এই সময় বিনুমামাকে বিরক্ত করতে মায়ের বেজায় আপত্তি কিন্তু আজ মাকে হঠাৎ ব্যতিক্রম দেখা গেল আগ্রহে মোড়া টেনে কাছে বসে বললেনহ্যাঁরে বিনু যখন কলকাতায় ছিলি কী নাকি এক ভয়ানক ব্যাপার হয়েছিল! সেই গল্পটা?’
হ্যাঁ রে দিদিবিনুমামা সামান্য গুছিয়ে বসে শুরু করলেনতখন কলকাতায় এক নামি কোম্পানির সেলস রেপ্রিজেন্টেটিভ মাস গেলে মাইনে সেলের উপর কমিশন সব মিলিয়ে রোজগার কম নয় কিন্তু কলকাতায় চাকরি নামেই হামেশাই ছুটতে হয় নানা জায়গায় মুসকিল হত থাকার ব্যবস্থা নিয়ে সেসময় ছোটখাটো মফস্বল শহরে তেমন ভাল হোটেল একেবারেই ছিল না তো এইভাবেই চলছিল এর মধ্যেই হঠাৎ কাজ পড়ল দূরের এক ছোট মফস্বল শহরে হঠাৎ কোম্পানির বড় কর্তাদের হুঁশ হয়েছে ওখানে প্রডাক্টের বিক্রি ভীষণ কম অর্ডার প্রায় নেই বললেই চলে সুতরাং ডাক পড়ল সমর আর আমার কাজের মানুষ বলে কোম্পানিতে দুজনের তখন যথেষ্টই কদর
দূর কম নয় সকাল আটটায় ট্রেন ধরেছিলাম নামতে প্রায় একটা বেজে গেল এরপর বাসে আরও ঘণ্টা দুয়েকের পথ সঙ্গে স্যাম্পলের মালপত্র বোঝাই দুটো ঢাউস বাক্স বাসের প্রশ্নই ওঠে না এছাড়া ভরসা বলতে রুটের অটো তিন চাকার কিম্ভূত এক ভ্যানগাড়ি তাও কখন আসবে ঠিক নেই স্ট্যান্ডে এক দালালকে ধরে ব্যবস্থা করা হল খানিক বাদে এক অটোভ্যান আসতে মালপত্র নিয়ে আমাদের ভিতরে বসার ব্যবস্থা হবার পরে ভাগ্যবান মাত্র জনা ছয়েক প্যাসেঞ্জার বসতে পারল অপেক্ষমান বাকি যাত্রীরা অবশ্য সেজন্য পরোয়া করল না যে যেখানে পারে ভ্যানের পাদানি নয়তো ছাদে বা পিছনে দাঁড়িয়ে গেল তিল ধারণের জায়গা রইল না এরপর সেই ভ্যান যখন চলতে শুরু করল দেখে মনে হবে গাড়ি নয় এক ঝাঁক মানুষ উড়ে চলেছে সেই গাড়িতেও দেখলাম চলতি পথে দিব্যি নতুন যাত্রী উঠছে
ওই অবস্থায় প্রায় ঘণ্টা দেড়েক পরে যখন যথাস্থানে পৌঁছুলাম প্রায় বিধ্বস্ত অবস্থা তবে ভ্যানের ড্রাইভার কথার খেলাপ করেনি কথামতো এক হোটেলের সামনেই নামিয়ে দিয়ে গেল এমন কী হেল্পার ছোকরাকে দিয়ে স্যাম্পলের বাক্স দুটোও কাঁধে করে পৌঁছে দিল হোটেলে গাড়িতে বসেই ড্রাইভার হেঁকে বললবাবুদের ভাল দেখে একটা ঘর দিও জনার্দনদা
ততক্ষণে হোটেলের দিকে তাকিয়ে আমরা তো থ হয়ে গেছি এমন ঝাঁ চকচকে হোটেল এই ধাপধাড়া জায়গায় মিলবে স্বপ্নেও ভাবতে পারিনি খুশিতে সমর তো জোরে একটা সিটিই দিয়ে উঠল কাউন্টারে মাঝবয়সী এক ভদ্রলোক বসে আছেন জুতোর মসমস শব্দে সমর এগিয়ে গিয়ে বললশুনলেন তো? চট করে ভাল দেখে একটা ঘর দিন তো জনার্দনবাবু ডবল বেড আগে একটু বিশ্রাম দরকার
সমর কিছুমাত্র বাড়িয়ে বলেনি ঘড়ির কাঁটা তখন তিনটের ঘর ছুঁতে চলেছে তার উপর এমন ঝাঁ চকচকে হোটেল দেখে চাহিদাও বেড়ে গেছে কিন্তু সমর খেয়াল না করলেও লক্ষ করেছিলাম আমাদের মালপত্র নিয়ে নামতে দেখে কাউন্টারে বসা জনার্দনবাবুর মুখ কেমন কাঁচুমাচু হয়ে গেছে তারপর ড্রাইভারের হাঁক শুনে শুকিয়ে প্রায় কাঠ হবার জোগাড় সমরের কথায় তিনি ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইলেন সেলস রেপ্রিজেন্টেটিভের কাজ কোথায় কী দরকার ভালই জানা আছে ছোকরার সেই মুখের দিকে তাকিয়ে সমর প্রায় হাঁক ছাড়ল এবাররুম তো আছে হোটেলে তবে অমন হাঁ করে কী দেখছেন দাদা?’
আজ্ঞে হ্যাঁ স্যার আছে তবেকোটপ্যান্টটাই পরা সমরের সেই হাঁকে বেজায় ঘাবড়ে গিয়ে কী বলতে গিয়েও থেমে গেলেন তিনি তারপর শশব্যস্তে উঠে দাঁড়িয়ে বললেনআপনারা একটু বসুন স্যার ম্যানেজারবাবুকে ডেকে আনছিআমাদের কিছু বলার সুযোগ না দিয়েই তিনি সিঁড়ি ভেঙে প্রায় দৌড় লাগালেন উপর তলার দিকে
ব্যাপারটা কী হল যখন ভাবছি কাউন্টারের জনার্দনবাবুর সঙ্গে প্রায় হন্তদন্ত হয়ে নেমে এলেন মাঝবয়েসী ম্যানেজার লুঙির উপর পাটভাঙা পাঞ্জাবি বোঝা যায় অবেলায় ঘরে বিশ্রাম নিচ্ছিলেন কোনও মতে গায়ে পাঞ্জাবি চাপিয়ে চলে এসেছেন কাউন্টারের ড্রয়ার থেকে চশমা বের করে নাকের উপর চাপিয়ে আমাদের দুজনের উপর এক পলক বুলিয়ে ঢোঁক গিলে বললেনআজ্ঞে স্যার জনার্দন ছেলেমানুষ আসলে উপরে ১৩ নং ঘরটা খালি আছে ঠিকই কিন্তু ঠিক ব্যবহার করার অবস্থায় নেই অনেক দিন খালি রয়েছে কিনা আপনারা বরং অন্য——
ভদ্রলোকের কথা শেষ হতে পেল না শুধু সমর নয় হাঁহাঁ করে উঠলাম আমিওওই ঘরটাই চাই আমাদের
কিন্তুসামান্য ঢোঁক গিললেন উনিকিন্তু স্যার প্রায় বছর খানেক হল ওই ঘরে কেউ থাকেনি
সো হোয়াট?’ সমর প্রায় খেঁকিয়ে উঠলসারাদিন জার্নি করে ভয়ানক টায়ার্ড ফাঁকা যখন আছে ওই ১৩ নং ঘরটাই চাই
এভাবে বলছেন যখনম্যানেজার অল্প ঢোঁক গিললেনদিচ্ছি তাহলে কিন্তু কোনও অসুবিধা হলে দোষ দেবেন না যেন
এসব মফস্বল শহরের হোটেলে বড় সমস্যা ইলেকট্রিসিটি কখন মিলবে ঠিক থাকে না কিন্তু যে কাজে এসেছি সারাদিন প্রায় বাইরেই কাটবে ইতিমধ্যে দেখে নিয়েছি টাউনের বাইরে হোটেলটা বেশ ফাঁকায় পিছনে দক্ষিণ দিকে বিশাল এক আধমজা জলা দুতলায় জানলা খুলে দিলে ফ্যান না হলেও চলে যাবে ম্যানেজারকে সেই কথাই বলেছিলাম কিন্তু ফল হল উলটো প্রায় হেঁচকি তুলে তিনি বললেনপিছনের জানলা একদম খুলবেন না স্যার এই হোটেলে ওটা একদম বারণ
ভদ্রলোকের সেই কথায় কেউই আর উত্তর করলাম না ততক্ষণে বুঝে ফেলেছি অযথা কথা বললেই কথা বাড়বে সময় নষ্ট
খাতাপত্রের কাজ সারা হতে ম্যানেজার নিজেই আমাদের উপরে দুতলার কোণের দিকে ১৩ নম্বর রুম খুলে দিলেন দেখে চোখ জুড়িয়ে গেল মেঝেতে কার্পেট পাতা চমৎকার ঘর ধুলো ময়লার লেশমাত্রও নেই অযথা কেন যে উনি রুমটা দিতে আপত্তি করছিলেন বুঝতে পারলাম না ভদ্রলোক অবশ্য বিদায় নেবার আগেও ফের সতর্ক করে দিয়ে গেলেনপিছনের জানলা একদম খুলবেন না স্যার বড্ড পচা কাদার গন্ধ
পিছনে একজন মালপত্র নিয়ে এসেছিল নামিয়ে দিয়ে বিদায় নিতেই সমর দরজা বন্ধ করে প্রথমেই ঘরের পিছন দিকের দুটো জানলাই খুলে দিল ফ্যান আগেই চালিয়ে দেওয়া হয়েছে তবু জানলা খুলতেই ঠাণ্ডা হাওয়ায় জুড়িয়ে গেল শরীর আর কী দারুণ দৃশ্য! দিগন্তবিস্তৃত বিল কোথাও টলটলে জলের উপর সবুজ শ্যাওলা আর কচুড়িপানা কাদা থাকলেও বেশিরভাগ অংশেই ধান চাষ হয়েছে চড়া রোদে সবুজের উপর দোল খাচ্ছে দামাল বাতাস চোখ জুড়ানো দৃশ্য এই ধাপধাড়া জায়গায় এমন দারুণ একটা ঘর পাওয়া যাবে ভাবাই যায় না
দুপুরে কারো খাওয়া হয়নি বিকেলে ভারি টিফিনের কথা বলে রাখা হয়েছিল চিকেন কারির সঙ্গে গোটা কয়েক করে গরম পরোটা দিয়ে সেটা সাঙ্গ হবার পরে নীচে লাউঞ্জে বসে শুরু হল কাজের কথা প্রায় শহরের বাইরে হোটেল আগামী কাল থেকে দুজনের জন্য দুটো গাড়ি দরকার হোটেলের ম্যানেজার ধনঞ্জয় বর্মণ তখন কাউন্টারেই ছিলেন তাঁকে বলতে উনি জানালেন দুটো অটোভ্যানের ব্যবস্থা আজই করে রাখবেন শুধু তাই নয় দোকানপাট টাউনের হালচাল সম্পর্কেও কিছু খোঁজখবর দিলেন
রাতে পাঁঠার মাংসের গরম ঝোল–ভাত দিয়ে ভূরিভোজের পরে সেই যে বিছানায় গা এলিয়ে দিয়েছিলাম আর হুঁশ ছিল না যাকে বলে এক ঘুমে রাত কাবার ভোর সকালে জানলা দিয়ে আসা ফুরফুরে বাতাসে ফের পাশ ফিরতে যাচ্ছি ক্যাঁক করে ডোরবেল বেজে উঠল সমর তখনও ঘুমোচ্ছে উঠে গিয়ে দরজা খুলে দিলাম দরজার ওধারে রীতিমতো উদ্বিগ্ন মুখে ম্যানেজার ধনঞ্জয়বাবু আমাকে দেখেই বড় একটা নিঃশ্বাস ফেলে বললেনবাপরে ভয়ানক চিন্তায় ফেলে দিয়েছিলেন স্যার সকালে খোঁজ নিতে শুনলাম সারা রাত্তিরে আপনাদের কোনও সাড়াশব্দ পাওয়া যায়নি তাই ছুটে এলামবলতে বলতে তাঁর চোখ পড়ল ঘরের পিছনের খোলা জানলার দিকে আঁতকে উঠে বললেনএ কী করেছেন স্যার! ওদিকের জানলা খুলতে মানা করেছিলাম না!
তা করেছিলেনপালটা সওয়াল আমারকোনও কাদার গন্ধ কিন্তু পাইনি কেউ বরং কী দারুণ হাওয়া বলুন দেখি!
তাই বুঝি!গোড়ায় ভদ্রলোক একটু থতমত খেয়ে গেলেও আমার কথায় চোখ দুটো যেন সামান্য উজ্জ্বল হয়ে উঠল আর কথা না বলে চলে গেলেন আমি দরজা বন্ধ করে ফের একটু গড়িয়ে নেবার জন্য এগোচ্ছি দেখি ইতিমধ্যে সমরও জেগে উঠেছে বিছানায় শুয়েই বললতুই কাল অনেক রাতে ঘরের ভিতর অন্ধকারে পায়চারি করছিলি?’
না তো!অবাক হয়ে বললামসেই যে শুয়েছি তারপর এই উঠলাম তাছাড়া ঘরে তো নাইট ল্যাম্প ছিল একেবারে অন্ধকার হবার কথা নয়!
সেই কথাই তো বলছি নাইট ল্যাম্প তখন অফ করা ছিল গোড়ায় ভেবেছিলাম লোডশেডিং কিন্তু ফ্যান চলছে দেখে ভুল ভাঙল কে বলে সাড়া দিয়ে উঠতেই পায়ের শব্দ থেমে গেল সেই মুহূর্তে ওদিকে তোর খাটটা কেমন মচমচ শব্দ করে উঠল কেউ খাটে উঠলে যেমন হয় কিন্তু তারপর বেড সুইচ অন করে দেখি তুই অঘোরে ঘুমচ্ছিস ব্যাপারটা কিছুই বুঝতে পারলাম না ঘুমচ্ছিস দেখে তোকে অবশ্য আর ডাকিনি ফের নাইট ল্যাম্পটা জ্বেলে দিয়ে শুয়ে পড়লামখানিক পরে সমর আবার বললআচ্ছা বিনোদ তোর ঘুমের ঘোরে এভাবে হেঁটে বেড়াবার অভ্যাস নেই তো? আমাদের কলেজের হোস্টেলে এমন একটি ছেলে ছিল কিন্তু
সমরের ওই কথায় হোহো করে হেসে ফেললাম এতদিন তোর সঙ্গে পরিচয় বরাবর একসাথে ট্যুর করে আসছি আজ হঠাৎ এই কথা বলছিস!
সমর কিন্তু থামল না বিছানায় উঠে বসল এবারসরি তবে আমার অবস্থা একবার বোঝার চেষ্টা কর তোর কথার পরে আমার তো এখন সন্দেহ হচ্ছে এই ঘরে কোনও গোলমাল আছে তারপর নম্বরটাও আবার ১৩ একেবারে সোনায় সোহাগা নইলে শুরু থেকেই ওরা এভাবে আপত্তি করবে কেন? তুই দরজা খোলার পরেই ঘুম ভেঙেছে আমার ম্যানেজার ভদ্রলোকের মুখটা দেখেছিলি? ভয়ানক দুশ্চিন্তায় ছিলেন উনি তাই ভোর হতেই ছুটে এসেছেন
মাথা নেড়ে বললামএকদম তবে ব্যাপারটা ভেঙেও তো বলছে না কেউ আজ একটু খোঁজ নেব তাহলে
তা নিতে পারিস কিন্তু আমার মনে হয় হোটেল আজই পালটানো দরকার সারা দিন তো টাউনেই ঘুরতে হবে তেমন হোটেলের খোঁজ পেলে সন্ধের মধ্যেই পালটে ফেলব ঠিক করেছি তুই কী বলিস?’
সমরের সেই মুখের দিকে তাকিয়ে সায় না দিয়ে উপায় ছিল না যাই হোক গাড়িতে স্যাম্পলের বাক্স চাপিয়ে যে যার মতো বেরিয়ে পড়েছিলাম যথাসময়ের মধ্যেই কে কোন এরিয়ায় কাজ করবে আগেই ঠিক করা ছিল কাজ বলতে বিরাট কিছু নয় সাহেবি পোশাকে গলায় টাই ঝুলিয়ে দোকান থেকে দোকানে ঢুঁ মারো ঝাঁ চকচকে পোস্টার আর গিফট ধরিয়ে দাও সেই সাথে কয়েকটা স্যাম্পল প্যাকেট আর কথার ফুলঝুরি এর উপর নামী কোম্পানির গুড উইল তো রয়েছেই বেশিরভাগ পার্টি তাতেই কাত হয়ে যায় তৎক্ষণাৎ কিছু অর্ডারও চলে আসে
এই পর্যন্ত বলে বিনুমামা থামলেন গল্পটা কোন দিকে বাঁক নিতে যাচ্ছে তখনও কেউ বুঝে উঠতে পারিনি তবে কিছু যে একটা ঘটতে চলেছে বুঝতে বাকি নেই অজান্তেই মামার কাছে ঘেঁসে এসেছি পুপুল বললসেদিন রাতেও ওই হোটেলে ছিলে?’
রাত কী বলছিস! তার আগেই তো ঘটে গেল ব্যাপারটাসামনে উৎসুক শ্রোতাদের উপর সামান্য চোখ বুলিয়ে নিয়ে বিনুমামা বললেনতবে তার আগের কথাও একটু বলা দরকার আমার ভ্যানের ড্রাইভার জগদীশের সঙ্গে কিছুক্ষণের মধ্যেই বেশ খাতির জমিয়ে ফেলেছিলাম এটা অবশ্য আমাদের কাজের মধ্যেই পড়ে একটু জমিয়ে নিতে পারলে নতুন জায়গায় অনেক সাহায্য পাওয়া যায় জগদীশের ক্ষেত্রেও ব্যতিক্রম হয়নি প্রবল উৎসাহে নিজেই দোকান বুঝে নিয়ে যাচ্ছিল আমাকে এমনকী স্যাম্পলের প্যাকেট পোস্টারও বয়ে দিচ্ছিল
অনেকক্ষণ ধরেই খেয়াল করছিলাম ছেলেটি কিছু বলার জন্য উসখুস করছে হঠাৎ বললস্যার শুনলাম হোটেলের ১৩ নম্বর ঘরে আছেন রাতে কোনও সমস্যা মানে কিছু দেখেননি?’
জগদীশের ওই কথায় সকালে সমরের ব্যাপারটা মনে পড়ল কাজের চাপে প্রায় ভুলেই গিয়েছিলাম কৌতূহলী হয়ে বললামকী ব্যাপার বলো দেখি? ম্যানেজার ধনঞ্জয়বাবুও ওই ঘর ভাড়া দিতে চাইছিলেন না একরকম জোর করেই নিয়েছি!
প্রত্যুত্তরে জগদীশ আমার দিকে তাকিয়ে অল্প ঠোঁট চাটল সামান্য ইতস্তত করে বললস্যার রাতে যখন কিছু হয়নি আর নাই বা শুনলেন
কিন্তু আমি ছাড়লাম না ওকে উসকে দিতেই বললামঠিক করেছি আজ বিকেলের মধ্যেই ছেড়ে দেব হোটেল বন্ধু সমর হয়তো এর মধ্যে নতুন হোটেলের খোঁজ শুরু করে দিয়েছে তাই বলতেই পারো
অল্প ভেবে ফের ঠোঁট চাটল জগদীশ হোটেল যখন ছেড়েই দেবেন তাহলে বলেই ফেলি স্যার বছর খানেক আগে হোটেল সবে চালু হয়েছে এক ভয়ানক ব্যাপার হয়েছিল ওই ১৩ নং রুমে
কী?’ জগদীশ থামতেই প্রশ্ন করলাম
হোটেল চালু হবার মাস খানেক পরে আপনাদের বয়সী দুই বন্ধু ওই ঘরে উঠেছিল রাতে এক বন্ধু অন্যজনকে খুন করে ফেরার হয়ে যায় এখনও পুলিশ তার খোঁজ পায়নি সারা টাউনে সে এক হইহই কাণ্ড
জগদীশ থামতেই হোহো করে হেসে উঠলাম আমি এই ব্যাপার! আরে হোটেলে এসব হামেশাই হয়ে থাকে কত রকমের মানুষ আসে তাতে রুম ভাড়া দেওয়া আটকাবে কেন?’
হাসির কথা নয় স্যার সেই ঘটনার পরে ওই রুমে কেউই এক রাতের বেশি থাকতে পারেনি রাতে কেউ নাকি অন্ধকার ঘরের ভিতর হেঁটে বেড়ায় অথচ আলো জ্বাললে কিছুই দেখা যায় না হাঁটার শব্দও থেমে যায় একবার তো আরও ভয়ানক ব্যাপার হয়েছিল জেগে উঠে ঘরের এক বোর্ডার ভয় পেয়ে চিৎকার করে উঠতেই এক ছায়ামূর্তি অন্ধকারে ছুটে গিয়ে খোলা জানলা দিয়ে লাফ দিয়েছিল বাইরে পিছনের বিলে তখন অনেক জল সেই জলে ভারি কিছু লাফিয়ে পড়ার জোরাল শব্দ হোটেলের অন্য ঘর থেকেও শোনা গিয়েছিল সেই থেকে ম্যানেজার ঘরের ওদিকের জানলা খুলতে মানা করে দিয়েছেন শুনেছিলাম ওই ঘর এখন আর ভাড়াও দেওয়া হয় না
দুপুরে একটার মধ্যে হোটেলে খেতে আসার কথা কাজ সেরে ফিরতে কিছু দেরিই হয়ে গেল রিসেপশন কাউন্টারে গতকালের সেই জনার্দনবাবু জিজ্ঞাসা করতে জানাল তিনি ঘণ্টা খানেক হল কাউন্টারে আছেন সমর এর মধ্যে ফেরেনি
রুমের দুসেট চাবির একটা সমরের কাছে অন্যটা রিসেপশন কাউন্টারেই থাকে সেটা চেয়ে নিয়ে উপর তলায় ঘরের দিকে গেলাম বাইরে বের হলে দুজনের এক সাথে খাওয়া অভ্যাস হাতমুখ ধুয়ে সমর না ফেরা পর্যন্ত সামান্য জিরিয়ে নেওয়া যাবে নতুন হোটেলের খোঁজেই হয়তো দেরি হচ্ছে বিকেলে যদি আবার হোটেল বদলাতে হয় তার আগে একটু বিশ্রাম মন্দ নয়
ভাবতে ভাবতে রুমের দরজা খুলে ভিতরে ঢুকেছি সমরের বেডের দিকে তাকিয়ে চমকে উঠলাম আপাদমস্তক চাদর মুড়ি দিয়ে সমর তার বেডে শুয়ে ঘুমোচ্ছে মাথার উপর ফুল স্পীডে ফ্যান ঘুরছে বুঝতে পারছিলাম কাউন্টারে জনার্দনবাবু বসার আগেই সমর ফিরে এসেছে ঘরে এসে আমার অপেক্ষায় থেকে শেষে ঘুমিয়ে পড়েছে তবু কৌতূহলে এগিয়ে গেলাম শীতকাল নয় এভাবে আপাদমস্তক চাদর মুড়ি দিয়ে ওকে কখনও ঘুমোতে দেখিনি
প্রায় অসাড়ে ঘুমোচ্ছে সমর অকারণে ডাকা ঠিক হবে কিনা খাটের পাশে দাঁড়িয়ে ভাবছি হঠাৎ সমরের শরীরের উপরের অংশ আচমকাই সোজা হয়ে উঠে এল মুখের উপর থেকে চাদর সরে যেতেই অন্তরাত্মা কেঁপে উঠল আমার সমর নয় একটা ফুলে ওঠা পচা মড়া চোখ দুটো ঠেলে বেরিয়ে এসেছে বেরিয়ে আসা কশের তীক্ষ্ণ দাঁত গালের দুপাশে কাঁচা রক্তের দাগ
অ্যাঁ!আঁতকে উঠে সবাই তখন বিনুমামার প্রায় কোলের উপর উঠে পড়েছি মা বললেনবলিস কী! ভ্যাম্পায়ার!
আমিও তাই ভেবেছিলাম রেজীবনে অমন ভয় খুব বেশি পাইনি তবে সাহস হারিয়ে ফেলিনি তাকিয়ে দেখি পাশেই টেবিলে সমরের ফল কাটার বড় ছুরিটা সেটা তুলে নিয়ে বসিয়ে দিতে যাব সেই পচা মড়া মুহূর্তে উঠে দাঁড়িয়ে পাশেই খোলা জানলা দিয়ে বাইরে লাফ দিল ঝপাং করে জলে পড়ার শব্দও শুনতে পেলাম হতভম্ব হয়ে ছুরি হাতে দাঁড়িয়ে আছি চোখ পড়ল বিছানার দিকে বিছানায় উঠে বসে ঘুম চোখে সমর অবাক হয়ে তাকিয়ে আছে আমার দিকে আমি চোখ ফেরাতেই সে আতঙ্কে বিছানা থেকে লাফিয়ে নেমে চিৎকার করতে করতে খোলা দরজা দিয়ে বাইরে ছুটে বেরুল
বিনুমামা থামলেন আমাদের কারো মুখেই কথা নেই মা বললেনতারপর?’
তারপর?’ বিনুমামা অল্প হাসলেনঅফিসে আমার সব চাইতে কাছের বন্ধু সমর এরপর কোনও সম্পর্কই আর আমার সাথে রাখেনি ওর দৃঢ় বিশ্বাস ঘোরের মধ্যে আমি ওকে খুন করতে গিয়েছিলাম আগের রাতেও নাকি ঘুমের ঘোরে সেই চেষ্টা করেছিলাম সেবারও হঠাৎ ওর ঘুম ভেঙে যাওয়ায় বেঁচে গেছে এমন বিপজ্জনক মানুষের সঙ্গে কে আর সম্পর্ক রাখে? ওর কথা ভেবে এরপর আমিও কোম্পানি ছেড়ে দিলাম আসলে সমর সেদিন হোটেলের কাউন্টারে জনার্দনবাবু বসার আগেই ফিরে এসেছিল ওর ভ্যানের ড্রাইভারের কাছে হোটেলের সব কথা সেও শুনেছিল রাতের সেই অভিজ্ঞতার কারণে বেজায় ঘাবড়ে গিয়ে ফিরে এসেছিল অনেক আগেই তেমন ভাল হোটেলও খুঁজে পায়নি কী করবে ভাবতে ভাবতে আমার অপেক্ষায় চাদর মুড়ি দিয়ে ঘুমিয়ে পড়েছিল তারপর
তাই বলে তোকে এমন ভুল বুঝবে? এতদিনের বন্ধু!মা বললেন
ওকে দোষ দেওয়া যায় না বিনুমামা অল্প মাথা নাড়লেনভয়ানক কিছু সেদিন ঘটে যেতেই পারত সমরের বিছানায় উঠে বসতে দেখেছিলাম পচে ফুলে ওঠা এক মড়াকে ছুরি বসিয়ে দেবার আগেই মড়াটা জানলা দিয়ে জলে লাফিয়ে পড়েছিল সেই শব্দ শুধু আমি নই হোটেলের অনেকেই শুনতে পেয়েছিল অথচ বিছানায় বসেছিল সমর ভৌতিক ছাড়া একে আর কী বলা যায়? ম্যানেজার ধনঞ্জয়বাবুর কথায় কর্ণপাত না করা একেবারেই ঠিক হয়নি স্বীকার করতেই হয়েছিল পরে ভগবান রক্ষা করেছেন
যাই হোক এই ঘটনার অনেক পরে কাগজে একটা খবর দেখেছিলাম এই গল্পের সঙ্গে সেটাও বলা দরকার সেই হোটেলের ১৩ নং রুমের পিছনে বিলের কাদায় পুলিশ জামাকাপড় পরা একটা পূর্ণ বয়স্ক মানুষের কঙ্কাল খুঁজে পেয়েছিল কঙ্কালের প্যান্টের পকেটে ছোট এক থলিতে গোটা কয়েক সোনার বাট তদন্তে প্রকাশ পেয়েছিল বছর কয়েক আগে ওই রুমে যে যুবক খুন হয়েছিলেন কঙ্কালটি তার ফেরারি সঙ্গীর পুলিশের অনুমান সঙ্গীকে খুন করে সোনার বাটগুলো হাতিয়ে নিয়ে পালাবার জন্য জানলা দিয়ে লাফ দিয়েছিল সে নীচে বিলের জল এত গভীর হবে হয়তো ভাবতে পারেনি সাঁতার না জানায় ডুবে মরেছিল দেহ ঘন কচুরিপানার নীচে চলে যাওয়ায় মৃতদেহও ভেসে ওঠেনি
ছবি: প্রকাশ গুপ্ত 
প্রথম প্রকাশ: ১৪২২ শারদীয়া ‘কলরব’


3 comments:

  1. 👌👌👌👌👌 superb

    ReplyDelete
  2. Besh bhalo chilo tobe samarer uthe bosar bapar ta kmon laglo...churi bosate giye samar uthe noslo...eikhne ekto kmon laglo..
    Overall bhalo legechr

    ReplyDelete