Sunday, 3 January 2016

রহস্য গল্প (মোবাইল ভার্শান): পুরোনো বাড়ি : শিশির বিশ্বাস


বাড়িটার খোঁজ এনেছিল ইলিয়াস ইলিয়াস শেখ ওস্তাদ মানুষ শুধু তাই নয় অনেক দিনের অভিজ্ঞ সেদিক দিয়ে পরাশর লাইনে একেবারেই নতুন দিন কয়েক ওকে দেখে ইলিয়াসের বুঝতে বাকি থাকেনি ছোকরা কিছু একটা সমস্যায় পড়েছে একান্তে ডেকে জিজ্ঞাসা করতে পরাশরও গোপন করেনি একে একে সবই খুলে বলেছিল বাড়ি থেকে মা ঘন ঘন তাগাদা লাগাচ্ছেন বউকে এবার না নিয়ে এলে আর চলছে না। সমস্যা বইকী।
সব শুনে ইলিয়াস শেখই মুশকিল আসান করে দিয়েছিল। শুধু পরমর্শ দিয়েই দায়িত্ব শেষ করেনি। বাড়িটাও খুঁজে দিয়েছিল। দাদারে মাহিম বে’র ধারে একেবারে পশ এলাকায় দুতলা বাড়িটার উপরের তলায় কী একটা ওষুধ–কোম্পানির স্টোর রুম ইদানীং সারাদিন প্রায় তালাবন্ধই থাকে তারই নীচের তলায় ফ্ল্যাটটা বাড়িটা পুরোনো হলেও মুম্বাই শহরে এই ক্রাইসিসের বাজারে নেহাত হেলাফেলার নয় রীতিমতো ঈর্ষার ইলিয়াস বাড়িটার খোঁজ দিতে প্রায় ঘাম দিয়ে জ্বর ছেড়েছিল পরাশরের বাড়ি একটা না পেলে উপায় ছিল না ইদানীং কলকাতা থেকে মা হঠাৎ যেভাবে তাড়া লাগাতে শুরু করেছেন তাতে নির্মলাকে না আনলে আর চলছে না মাকে দোষ দেওয়া যায় না পুরোনো দিনের মানুষ নির্মলা হঠাৎ নতুন করে পড়াশোনা শুরু করার তোড়জোড় না করলে আরও কিছুদিন হয়তো কাটিয়ে দেওয়া যেত ভেবেচিন্তে নিজেই হয়তো একটা উপায় বের করতে পারত।
বিয়েটা একরকম চাপে পড়েই করতে হয়েছিল সেসময় বাবা মারা গেছেন আগেই বাড়িতে মা একা ও মুম্বাইতে কাজের ধান্দায় হঠাৎ মায়ের অসুস্থ হবার খবর পেয়ে ছুটে যেতেই হয়েছিল এরপর সামান্য সুস্থ হয়েই মা যখন ওর বিয়ের জন্য পীড়াপীড়ি শুরু করলেন বুঝতে বাকি থাকেনি মার আসল উদ্দেশ্য ছিল ওটাই পাত্রী ঠিক করাই আছে পরাশরের অপছন্দ হলে তিনি জোর করবেন না
মায়ের মুখের দিকে তাকিয়ে পাত্রী দেখতে শেষ পর্যন্ত রাজি হতেই হয়েছিল ভেবেছিল পাত্রী দেখার পরে মাকে জানিয়ে দিলেই হবে পছন্দ হয়নি কিন্তু নির্মলাকে দেখার পরে ইচ্ছেটা পালটাতে হয়েছিল আসলে বয়সটাও তো সেদিন আড়াই বছর কম ছিল পরে পরাশর একান্তে ব্যাপারটা ভাবতে গিয়ে বুঝেছে আসল কারণ মা নয় ছিল সেটাই
আড়াইটা বছর একটি নারীর জীবনে সম্ভবত খুব দীর্ঘ সময় নয় তবু আড়াই বছর আগের সেই দেড় মাসের স্মৃতি নির্মলার কাছে যেন এক যুগ আগের কথা মায়ের অসুখের কারণে সেবার দিন পনেরোর জন্য কলকাতায় এসেছিল তবু বিয়ের পর কাটিয়ে দিয়েছিল পুরো দেড়টি মাস সেই সামান্য কটি দিনের অসংখ্য ছোটখাটো স্মৃতি এখন নির্মলার কাছে প্রায় স্বপ্নের মতো যাওয়ার আগের রাতে মানুষটা ওকে কথা দিয়ে গিয়েছিল মুম্বাই ফিরে যেভাবেই হোক একটা ফ্ল্যাটের ব্যবস্থা করেই নিয়ে যাবে হয়তো মাস খানেকের মধ্যেই তারপর কত মাস চলে গেল পরাশর আর আসেনি গোড়ায় ঘনঘন ফোন আসত সান্ত্বনা দিত মায়ের কথা ভেবে নির্মলার আরও কিছু দিন কলকাতায় থাকা দরকার এছাড়া অনেক চেষ্টা করেও ফ্ল্যাট এখনও জোগাড় করে উঠতে পারেনি তারপর ক্রমে ফোন কমতে থাকল নির্মলা কখনও ফোন করলেও সব সময় উত্তর পাওয়া যেত না তারপর তো কী কারণে পরাশর ফোনটাই বদলে ফেলল নিরুপায় হয়ে নির্মলা চিঠি দিলেও উত্তর মিলত না ইদানীং নির্মলাও আর লেখে না
পরাশর কোনও দিন যে ওকে মুম্বাইয়ে নিজের কাছে নিয়ে যাবে তেমন আশা এখন ছেড়েই দিয়েছে বাড়ির অবস্থা মোটেও সচ্ছল ছিল না বাবার ছোট এক সেলাইয়ের দোকান কোনও মতে চলে যেত প্রায় জোর করেই লেখাপড়াটা চালিয়ে যাচ্ছিল ও ইচ্ছে ছিল লেখাপড়া শিখে চাকরি করবে বাবার কিছু সাশ্রয় হবে কিন্তু বাবা–মার ইচ্ছে ছিল আলাদা তাঁরা ঠিক করেই ফেলেছিলেন তেমন পাত্র পেলে মেয়ের বিয়ে দিয়ে দেবেন কয়েকটি সম্বন্ধও এসেছিল তারমধ্যে প্রস্তাব এল এখান থেকে ওকে দেখে শাশুড়িমার খুব পছন্দ হয়েছিল মুম্বাই শহরে ব্যবসা আছে পাত্রের ছোট হলেও রোজগার খারাপ নয় কলকাতার বাড়িতে শাশুড়িমা একাই থাকেন বাবা–মা এক কথায় রাজি হয়ে গিয়েছিলেন দেরি হচ্ছিল কাজের চাপে পাত্রের সময়মত কলকাতায় আসতে না পারার কারণে
কথাবার্তা যখন পাকা হয় নির্মলা তখন ক্লাস নাইনে পড়ে আর বিয়ে ক্লাস টেনে ওঠার পর টেস্টের অল্প কিছুদিন আগে পড়াশুনোয় তাই ইতি টানতে হয়েছিল আর এগোয়নি ইদানীং তাই জোর করেই মাধ্যমিক দেবার জন্য তৈরি হচ্ছিল ইচ্ছে ছিল পড়াশোনা যদি আরও কিছুটা এগিয়ে নিতে পারে একটা চাকরির চেষ্টা করবে শাশুড়ি মায়ের অবশ্য একেবারেই ইচ্ছে ছিল না তাই নিয়ে অশান্তিও হয়েছে কিন্তু এই আড়াই বছরে নির্মলার অভিজ্ঞতাও কম হয়নি তাই কান দেয়নি কিন্তু সব ফের ওলটপালট হয়ে গেল
কোনও খবর ছাড়াই পরাশর হঠাৎ একদিন কলকাতার এসে হাজির মানুষটাকে হঠাৎ ওইভাবে বাড়ি আসতে দেখে ভীষণ অবাক হয়ে গিয়েছিল নির্মলা অভিমানে সারাদিনে একটি কথাও বলেনি কিন্তু রাতে ওর চিবুকটা ছোট্ট করে নেড়ে দিয়ে পরাশর যখন বললএবার তোমায় নিয়ে যাব নির্মলা অনেক কাঠখড় পুড়িয়ে তোমার জন্য মনের মতো একটা ফ্ল্যাট জোগাড় করেছি দাদারে সমুদ্রের গায়ে প্রায় গোটা একটা বাড়ি!
নির্মলা মুহূর্তে ভুলে গিয়েছিল সব মানঅভিমান টানাটানা দুই চোখ মেলে বলেছিলসত্যি!তারপর ঝাঁপিয়ে পড়েছিল মানুষটার বুকে

মনের মতো বাড়ি বলেছিল পরাশর কিন্তু প্রথম চোখে বাড়িটা দেখেই কেমন থমকে গেল নির্মলা চোখ দুটো আপনা থেকেই কুঁচকে উঠল নাগপুরের কাছে লাইনে কী একটা গোলমালের কারণে মুম্বাই মেল প্রায় আট ঘণ্টা লেট ট্রেন দাদার স্টেশনে থামল প্রায় তিনটে নাগাদ ট্যাক্সি নিয়ে ফ্ল্যাটে পৌঁছোতে আরও প্রায় আধ ঘণ্টার মতো গত দুটো রাত ট্রেনে অজানা এক সুখানুভূতিতে ভরপুর হয়ে ছিল নির্মলা বিয়ের পর এই প্রথম ও স্বামীর ঘর করতে চলছে অথচ কেন যে হঠাৎ অমন হল!
পরাশর বাড়িয়ে বলেনি বাড়িটা সমুদ্রের গায়েই বলা যায় মেঘলা দিন বিকেলের মরা আলোয় বাড়িটা দেখে তবু একটুও ভাল লাগেনি পরাশরকে অবশ্য বলেনি কিছু হাসবে
বেশ পুরোনো বাড়ি নীচতলায় পাশাপাশি বড় দুটি ঘর একটি ড্রইংরুম বারবার ঘুরেফিরে দেখেও কিছুতেই পছন্দ হচ্ছিল না নির্মলার দরকারি সবই প্রায় রয়েছে খাট আলমারি সোফাসেট পুরোনো সেগুন কাঠের ফার্নিচার তবু সব কেমন অগোছালো দেয়ালে কতকালের পুরোনো ঝুল ফ্যানের ব্লেডে মাকড়শার জাল ধুলোর আস্তর আর কেমন একটা ভ্যাপসা গন্ধ গা ছমছম করছিল শুরু থেকেই একটু উসখুস করে শেষ পর্যন্ত বলেই ফেললএ কেমন বাড়ি ঠিক করেছ তুমি আমার একটুও ভাল লাগছে না
ড্রইং রুমে পাখা চালিয়ে দিয়ে পরাশর সামান্য জিরিয়ে নিচ্ছিল ঝাড়পোঁছের কাজ রয়েছে নিজেকেই সারতে হবে বউয়ের কথায় অল্প নড়ে উঠল মুম্বাই শহরের এই বাজারে একটা বাড়ি জোগাড় করা যে কী ভীষণ ব্যাপার নির্মলা জানবে কেমন করে একটা ছোট ঘর জোটাতেও এখানে হিমসিম খেতে হয় সেই হিসেবে পরাশর তো গোটা একটা প্রাসাদই জোগাড় করে ফেলেছে! দাদারের মতো জায়গায় প্রায় একটা পুরো বাড়ি! সামান্য হেসে বললএকদম নতুন জায়গা তো তাই অমন মনে হচ্ছে দুচার দিন থাকলেই সব ঠিক হয়ে যাবে
কথাটা মিথ্যে নয় কলকাতা আর শহরতলির বাইরে কোথাও যায়নি অস্বস্তি একটু হতেই পারে কিন্তু নির্মলা মানতে চাইল না ধপ করে স্বামীর পাশে বসে পড়ে মাথা ঝাঁকালদুচার দিন কী বলছো! একা এখানে আমি একটা দিনও থাকতে পারব না মাগো কী নির্জন!
পরাশর হোহো করে হেসে উঠল এবার নির্জনের কথা বলছো? তা ঠিক পশ এলাকা তবে সেজন্য ভেবো না কালই একটা কাজের মেয়ের ব্যবস্থা করে দেব সারাদিন দেখাশোনা করবে
তুমি তুমি ভোলাচ্ছ আমাকেফের মাথা ঝাঁকাল নির্মলা
কেন? কেন ওকথা বলছ?’ থতমত খেল পরাশর
এই মুম্বাই শহরে তুমি হঠাৎ চাইলেই তেমন কাজের মেয়ে পাবে?’
ওহ তাই বলো!হোহো করে হেসে উঠল পরাশর তা ঠিক তবে এই বাজারে তোমার জন্য পশ এরিয়ায় এমন একটা বাড়ি যখন জোগাড় করতে পেরেছি ভেবো না ওটাও হয়ে যাবে
আমি আমি কিন্তু একটি দিনও এখানে একা থাকতে পারব না মাগো!
ঠিক আছেনির্মলার মাথায় হাত রাখল পরাশর কথা দিচ্ছি যতদিন না একটা কাজের মেয়ে জোগাড় করতে পারছি বাড়িতে তোমার কাছেই থাকব কোথাও যাব না ঠিক আছে?’
ব্যাপারটা এখানেই ইতি হওয়া উচিত ছিল কিন্তু আমাদের জীবন কী সব সময় সবকিছু মেনে চলে? ঘণ্টা দেড়েক পরের কথা পরাশর বাইরের ঘরে সামান্য গোছগাছে ব্যস্ত হঠাৎ ওদিকের বাথরুম থেকে নির্মলার তীক্ষ্ণ আর্তনাদ হাতের কাজ ফেলে তৎক্ষণাৎ ছুটে গেল পরাশর বাথরুমের দরজা খোলা ভিতরে দাঁড়িয়ে নির্মলা থরথর করে কাঁপছে
কী কী হয়েছে নির্মলা? অমন করছ কেন?’
নির্মলা স্বামীর দিকে তাকাল ওর সারা মুখ আতঙ্কে বিবর্ণ তুমি তুমি আমাকে এখুনি এবাড়ি থেকে নিয়ে চলো
কেন কী হয়েছে?’
এই দ্যাখো!বাথরুমের মেঝে চমৎকার মোজাইক টালিতে বাঁধানো নির্মলা প্রায় টলতে টলতে তারই একটা পায়ের আঙুল দিয়ে সামান্য চাপ দিতে আলগা টালি ঢকঢক করে নড়ে উঠল
ওহ এই কারণে তুমি অমন নার্ভাস হয়ে পড়েছ! পুরোনো বাড়ি তো কিচ্ছু ভেবো না আমি এখুনি বাজার থেকে বালিসিমেন্ট এনে এঁটে দিচ্ছি
তাই তাই দাও ওটা এখুনি এঁটে দাও তুমি ভীষণ ভয় করছে গো!নির্মলা ঢলে পড়ল পরাশরের কোলে
গোছগাছ কিছুই আর হল না স্ত্রীকে সামান্য শান্ত করেই পরাশর বালিসিমেন্টের খোঁজে বাজারের দিকে বের হল ফিরতে একটু দেরিই হয়ে গেল ওর নির্মলা বারবার বলে দিয়েছিল সন্ধের আগেই ফিরে আসতে বাড়িতে ঢোকার মুখে পরাশর ঘড়ির দিকে তাকাল আটটা বেজে পাঁচ হলেও দেশের পশ্চিম প্রান্তে এই মুম্বাই শহরে সবে সন্ধেই বলতে হয় সামান্য ঠেলা দিতেই খুলে গেল দরজা ড্রইং রুমের মাঝে ছড়ানো একরাশ জিনিসপত্রের সামনে বড় সোফাটায় গা ছেড়ে দিয়ে শুয়ে আছে নির্মলা
রাতের খাবার নিয়ে এসেছিল তারই সামান্য মুখে দিয়ে একটু বাদেই পরাশর বাথরুমে ঢুকে পড়ল তারপর সারা রাত ধরে কুশলী হাতে নিপুণভাবে এঁটে দিল বাথরুমের সেই আলগা টালিগুলো কাজ সম্পূর্ণ হল শেষ রাত নাগাদ নাহ স্বয়ং ইশ্বরেরও এখন বোঝার উপায় নেই কোনও কালে দাদারের এই পুরোনো বাড়ির বাথরুমের গোটা কয়েক টালি সত্যিই আলগা ছিল
ভোর হবার আগেই মালপত্রগুলো গুছিয়ে নিয়ে বেরিয়ে পড়ল পরাশর খানিক এগিয়ে একটা ট্যাক্সি পেয়ে যেতেই হাত তুলে থামিয়ে উঠে পড়ল নাহ বাড়িটা আর দরকার নেই বাড়িওয়ালাকে জানিয়ে দেবে ইলিয়াস

ছবি: প্রকাশ গুপ্ত

6 comments:

  1. Bujhte parlamna ki hoyechilo ??

    ReplyDelete
    Replies
    1. ‘পুরোনো বাড়ি’ রহস্য গল্প হলেও কিছু ভিন্ন গোত্রের। কিছুটা পরীক্ষামূলক বলা যায়। সব কথা খুলে বলা হয়নি। তবে গল্পের ভিতর ইঙ্গিত রয়েছে যথেষ্ট। একটু ধরে পড়লে বুঝতে অসুবিধা হবার কথা নয়। তবু সামান্য কিছু hints: গল্পের প্রথম দিকটা একটু ধরে পড়ুন‚ বুঝতে খুব অসুবিধা হচ্ছে কি যে‚ মুম্বাই শহরে পরাশরের কাজ একেবারেই সহজ পথে ছিল না। তার সঙ্গীসাথীরাও সহজ পথের মানুষ নয়। মায়ের চাপে পড়ে হঠাৎ বিয়ে করে ফেললেও বউকে মুম্বাইতে নিয়ে আসা একেবারেই সম্ভব ছিল না। আর তাই…

      Delete
  2. বাহ! এক্সেলেন্ট!

    ReplyDelete
    Replies
    1. অনেক ধন্যবাদ।

      Delete
  3. Bhalo besh, tobe mon ta bhari hoe galo, je manush ta nijer maayer Sukh dukkher Kotha bhabe, se ato kharap hote pare bhebe...

    ReplyDelete