Saturday, 3 January 2015

ছেলেবেলার ভাললাগা গল্প (মোঃ ভাঃ): মুন্না সারেং (সরোজকুমার রায়চৌধুরী)


ছেলেবেলার ভাললাগা গল্প:

মুন্না সারেং
সরোজকুমার রায়চৌধুরী
মুন্না সারেং-এর সঙ্গে সেই আমাদের প্রথম আলাপ।
ফাল্গুনের অপরাহ্ন। তখনও শীতের আমেজ আছে। আমরা পাঁচহয় জন বন্ধু স্কুলের কি একটা বন্ধের দিনে যাদুঘর দেখতে এসেছিলাম। দেখা শেষ করে হল্লা করতে করতে বাইরে এসে যাদুঘরের সামনের মাঠে গিয়ে বসলাম। তখনও খানিকটা বেলা আছে। অথচ সন্ধ্যার আগে বাড়ি ফেরারও কারও ইচ্ছা নেই। সুতরাং মাঠে গিয়ে বসা ছাড়া উপায় কি?
পাশেই গাছের ছায়ায় একটি ঝাঁকামুটে ঝাঁকায় মাথা রেখে নিশ্চিন্তে নিদ্রামগ্ন। তার দেহের খানিকটায় বিকেলের মিষ্টি রোদ এসে পড়েছে। অদূরে কয়েকটি ফিরিঙ্গী শিশু খেলা করছে। আর তাদেরই আয়ারা গোল হয়ে বসে নিয়ে নিজের প্রভুগৃহের আভ্যন্তরীণ ব্যাপার নিয়ে জমাটি সভা বসিয়েছে। তাদের একটু দূরে একটি চানাচুরওয়ালা তার পশরা নামিয়ে শিকারের সন্ধানে ইতস্তত দৃষ্টি নিক্ষেপ করছে।
এই পরিবেশের মধ্যে একটা অপেক্ষাকৃত নিরিবিলি জায়গা বেছে নিয়ে তর্কের নামে আমাদের হল্লা চলেছে। বিতর্কের বিষয়বস্তু হচ্ছে, যাদুঘরের প্রবেশপথেই যে তিমি মাছের চোয়ালটা দাড়িয়ে আছে, সেইটে।
মণীন্দ্র বললে, চোয়ালটাই যদি অত বড় হয়, তাহলে মাছটা কত বড় কল্পনা কর।
হেমাঙ্গ সেই কল্পনাটা পাটিগণিতের ছকে ফেলবার চেষ্টায় বললে, মনে কর একটা মস্ত বড় কাৎলা মাছের চোয়াল। তার কত গুণ হবে?
নবেন্দু বললে, তার ছোটদির বিয়েতে যে কাৎলা মাছটা এসেছিল, তার চেয়ে বড় কাৎলা মাছ সে দেখেনি। এক মণের কাছাকাছি ওজন। তার চোয়ালটা…,
বাধা দিয়ে প্রেমাংশু বললে, ওর চেয়ে বড় বোয়াল মাছ আমাদের নদীতে ধরা পড়েছিল। তার পেটের মধ্যে একটা ছোট ছেলের বালা-পরা হাত পাওয়া গিয়েছিল। ওজন কত জানিনে, কিন্তু লম্বায় হাত চারেক নিশ্চয়ই হবে।
ওজনের চেয়ে লম্বাটাই হেমাঙ্গের বেশি দরকার। বললে, খুব ভালো। তার চোয়ালটা কত বড় হবে?
চোয়াল কেউই মাপেনি। মাছের দেহটার সঙ্গেই লোভী মানুষের কারবার। কে চোয়াল মাপতে যায়!
সুতরাং প্রেমাংশু চোয়ালের মাপ দিতে গিয়ে বিব্রত হয়ে উঠল। আমি তাকে সাহায্য করবার জন্যে বললাম, ধর আধ হাত। কল্যাণ হো হো করে হেসে উঠল। বললে, দূর! সব বাজে!
কি বাজে? আমি বললাম, আধ হাত হবে না!
কল্যাণ তেমনি হাসতে হাসতে বললে, আধ হাতের কথা নয়।
-তবে? কিসের কথা? চার হাত বোয়াল মাছ হয় না?
প্রেমাংশু রেগেই উঠল।
কল্যাণ বললে, না রে, তা বলছি না। আমি তিমি মাছের কথা বলছি।
তিমি মাছের কি কথা?
প্রেমাংশুর রাগ তখনও কমেনি। শুধু এবারে বলে নয়, যখনই কোনো একটা আলোচনায় আমরা মেতে উঠি, দেখা গেছে তখনই কল্যাণ বিজ্ঞের মতো হো হো করে হেসে আমাদের সেই তপ্ত আলোচনা জল ছিটিয়ে নিবিয়ে দেবার চেষ্টা করে।
সুতরাং শুধু প্রেমাংশু নয়, আমরা সবাই অল্প-বিস্তর রেগে উঠেছিলাম।
কল্যাণ কিন্তু আমাদের রাগের দিকে ভ্রক্ষেপ না করেই যেন আগের কথার জের টেনে বললে, আমার জামাইবাবু বলছিলেন, এটা তিমি মাছের চোয়ালই নয়।
কিসের চোয়াল তবে?
-ওটা জমানো পাথর।
কী সর্বনাশ! আমরা স্তম্ভিত হয়ে গেলাম।
তাছাড়া উপায় কি! কল্যাণের সত্যিই কোনো জামাইবাবু আছেন কি না ভগবান জানেন। কল্যাণ বলে, তিনি ডি. এসি. উপাধিধারী জনৈক জমকালো অধ্যাপক। তার উপরে কথা বলার স্পর্ধা আমাদের নেই। কিন্তু আমাদের সন্দেহ আছে, এমন একজন জামাইবাবু যদি তার থাকেও, কল্যাণ তার মস্ত বড় উপাধিটার খোঁচা দিয়ে তার নিজেরই তত্ত আমাদের নিরীহ ঘাড়ের উপর চাপিয়ে দেয়। ও যা ছেলে, ওর পক্ষে তা অসম্ভব নয়।
এবারও তাই করছে কি না, স্তব্ধ হয়ে সেইটে যখন ভাবছি, তখন নীল কোর্তাপরা দাড়িওয়ালা একজন লোক একেবারে আমাদের গা ঘেঁষে এসে বসল। আমাদের থেকে দু'তিন হাত দূরে এতক্ষণ নিঃশব্দে এ বসে ছিল। সম্ভবত আমাদের আলোচনা উপভোগ করছিল।
হেসে বললে, আজ্ঞে না বাবু, ওটা তিমি মাছেরই চোয়াল।
সঙ্গে সঙ্গে আমাদের গুন্তিত ভাবটা কেটে গেল এবং একজোড়া করে কৌতূহলী চোখ যেন বিদ্যুৎবেগে তার প্রশান্ত মুখের উপর নিবদ্ধ হল।
কল্যাণ জোর করে একবার বলতে গেল, আমার জামাইবাবু বলেন,
কিন্তু লোকটি নির্বিকার। বললে, তিনি বলতে পারেন। কিন্তু ওটা তিমি মাছেরই চোয়াল। তবে বাচ্চা তিমির।
বাচ্চা তিমির! বল কি!
আজ্ঞে হ্যা। খুব বাচ্চা তিমির চোয়াল।
লোকটি তার দাড়ির ফাঁকে ফাঁকে মিষ্টি মিষ্টি হাসতে লাগল।
বললে, আমি মুন্না সারেং। জাহাজে সারেং-গিরি করে সারা দুনিয়া ঘুরে এসেছি। বড় তিমি কত বড় শুনবেন?
সবাই তাকে সাগ্রহে ঘিরে বললাম শুনব, শুনব।
লোকটির বয়স চল্লিশ, কি তার দু'এক বছর বেশি। কিন্তু যে কাজ সে করে, বোধহয় তার জন্যেই, মুখের চামড়ায় কেমন একটা কর্কশতা এসেছে। তার উপর সামনের একটি দাঁত না থাকায় বয়স অনেক বেশি মনে হয়। মাথার চুলের চেয়ে দাড়িতে পাক ধরেছে বেশি। কিন্তু সেই পাকা দাড়ির ফাঁকে যে হাসি দেখা যায়, তা একেবারেই শিশুর মতো। সেদিকে চাইলে, ওর পাকা দাড়ি, ভাঙা দাঁত এবং কর্কশ চামড়ার কথা ভুলে গিয়ে ওকে আমাদেরই সমবয়সী মনে হয়।
লোকটি বললে, শুনুন তবে বড় তিমি মাছের কথা।
আমাদের জাহাজ সেবারে লিভারপুল থেকে নিউইয়র্ক যাচ্ছে। লম্বা পাড়ি। আটলান্টিকের ওপর দিয়ে চলেছি তো চলেইছি। দিনের পর দিন, রাত্রির পর রাত্রি। একটানা, একঘেয়ে। সূয্যি সকাল বেলায় উঠছে, সন্ধ্যে বেলায় ডুবছে। তারপরে অন্ধকার। তখন মনে হয় আর কোনদিন সূয্যি উঠবে না, কোনোদিন অন্ধকার কাটবেনা, কোনোদিন নিউইয়র্কে পৌছব না।
ভাবতেও বুকের ভিতরটা ছমছম করে উঠত। গায়ে কাঁটা দিত। নিজেদের চেনা জাহাজটাকেই কেমন অচেনা মনে হত। মনে হত, কোথাকার একটা ভুতুড়ে জাহাজ।
আটলান্টিককে সবাই ভয় পায়। দরিয়া যেন সব সময়েই মারমুখখা। এর ওপর কখন যে ঝড়-তুফান ওঠে তারও ঠিক নেই। যখন কাজকর্ম থাকে তখন বেশ থাকা যায়। মুস্কিল হয়, যখন কাজ থাকে না, ছুটি। অন্য লস্করের কি হয় জানি না, আমার তো আটলান্টিকের পথে জাহাজে পাড়ি দেবার সময় রাত্রে ছুটি থাকলে ঘুম প্রায়ই হত না।
প্রেমাংশু জিজ্ঞাসা করলে, আমেরিকা কি ওই একবারই গেছ?
একবার!—মুন্না হাসলে,কতবার গিয়েছি। কিন্তু কি যে আমার সঙ্গে আটলান্টিকের সম্বন্ধ, যতবার গিয়েছি, অমনই ভয় করেছে। মনের মধ্যে একদিনও সোয়াস্তি পাইনি। অত লোকের মধ্যে থেকেও খালি ভয় করেছে, খালি ভয় করেছে। কি রকম যেন একটা ভুতুড়ে ভয়। গা ছম ছম করে। থেকে থেকে চকমক করে চারিদিকে চাই। অথচ কেন যে ভয় করে তাও জানি না।
মুন্না সারেং আমাদের দিকে চেয়ে চেয়ে হাসতে লাগল।
অর্থাৎ তখন আটলান্টিকে জাহাজের উপর তার ভয় করত, আর এখন নিজের দেশে নিশ্চিন্তে বসে সেইটেই তার কাছে হাসির ব্যাপার!
জিজ্ঞাসা করলাম, তারপর?
তারপর চলেছি। একদিন, দু'দিন, তিনদিন, এমনি করে অনেক দিন। সেদিন দিনের বেলায় আমার ছুটি। খেয়ে-দেয়ে দিব্যি ঘুমুচ্ছি। হঠাৎ সারেং–লস্করের চিৎকারে ঘুম ভেঙে গেল।
কী ব্যাপার? ঝড়-তুফান?
মুন্না হেসে বললে, প্রথমে আমিও তাই ভেবেছিলাম। চারিদিক অন্ধকার। ভেবেছিলাম, মেঘে অন্ধকার। তখনই জাহাজের বিজলী আলো জ্বলে উঠল বটে, কিন্তু সবারই মুখে একটা সামাল, সামাল ভাব। জাহাজের সাইরেন বেজে উঠল। আমরা যে-যার জায়গায় গিয়ে দাড়ালাম। কাপ্তেন ছুটতে ছুটতে নিচে এলেন। সবাইকে হুসিয়ারী করে দিলেন। কিন্তু কিসের যে হুঁসিয়ারী কেউ কিছু বুঝতে পারলাম ।
এর-ওর মুখের দিকে চাই। জিগ্যেস করি, কি ব্যাপার? সবারই চোখ-মুখে ভয়। সবাই নিঃশব্দে মাথা নাড়ে। কেউ কিছু জানে না। কাপ্তেন হয়তো জানেন, কিন্তু তাকে শুধোবে এমন কলিজা কারও নেই।
এমনি চলল মিনিট পোনেরো। আমার তো মনে হল, এক ঘণ্টাই হবে বুঝি। চারিদিকে শুধু আঁশটে গন্ধ। নাক বন্ধ করেছি। তবু সেই গন্ধে গা গুলিয়ে উঠছে। বমি-বমি করছে।
কী রে বাবা!
দরিয়া তো আমাদের ঘর-বাড়ি হয়ে উঠেছে। সারা দুনিয়া জাহাজে ঘুরেছি। কিন্তু এমন আঁশটে গন্ধ তো কোথাও পাইনি বাবা! কিসের গন্ধ? দরিয়া তো আর জমিন নয় যে, কেউ পথের ধারে দুর্গন্ধ ময়লা রেখে যাবে! আমাদের জাহাজেও এমন কিছু নেই যে, গন্ধ উঠবে। তাহলে তো সে গন্ধ জাহাজে ওঠবার সময় থেকেই পেতাম।
এই সব ভাবছি আর মনে মনে কান মলছি, ভালোয় ভালোয় একবার দেশে ফিরতে পারলে আর আটলান্টিকের জাহাজে কখনও চড়ছি না। খেতে পাই, আর না পাই। জানটা তো সক্কলের আগে।
মুন্না আমাদের সামনে আবার নতুন করে নাক-কান মলতে লাগল।
আমাদেরও ভয়ে গলা শুকিয়ে উঠেছিল। ঝড় নয়, তুফান নয়, অথচ অন্ধকার কেন? আঁশটে গন্ধই বা আসে কোথা থেকে?
মাঠেও তখন অন্ধকার নেমেছে। দূরে মাঠের অন্ধকারের বুক চিরে আলোঝলমল বাস-ট্রাম চলছে।
আমাদের সন্দেহ হচ্ছে, ওগুলো বোধ হয় ট্রাম-বাস নয়, মুন্না সারেং-এর ভুতুড়ে জাহাজ। স্থানটাও গড়ের মাঠ নয়, আটলান্টিক মহাসমুদ্র। আমাদের চোখের সামনে ভেসে উঠেছে তখন আমাদের পাঠ্যপুস্তকের সেই বিখ্যাত ইংরাজি কবিতা “The Lays of Ancient Mariner" সেই মরা এ্যালবাট্রস পাখি! একটার পর একটা মরে যাচ্ছে মাঝি-মাল্লার দল। জল নেই, পানীয় জল কোথাও নেই। হাওয়া স্তব্ধ হয়ে গেছে। সঙ্গে সঙ্গে জাহাজখানিও।
অন্তত আমার মনে হল, এই লোকটা সেই প্রাচীন নেয়ে নয় তো? আবার এসেছে এই সন্ধ্যায় তেমনি আর একটা ভয়াবহ কাহিনী শোনাতে!
ওর থেমে যাওয়াটা যেন গ্রীষ্মের দুপুরে হঠাৎ হাওয়া বন্ধ হয়ে যাওয়া। নিশ্বাস নিতে কষ্ট হয়। বুকের ভিতরটা অস্থির হয়ে উঠে। ওর থেমে যাওয়া কেউই আমরা সহ্য করতে পারছিলাম না।
বললাম, তারপরে?
তারপরে? তারপরে কি আরম্ভ হল জানেন? যেন একটা ভূমিকম্প। পোনেরো মিনিট ধরে ভয়ঙ্কর একটা ভূমিকম্প। আমরা কখনও গড়াতে গড়াতে জাহাজের ডেকের একদিক থেকে অন্যদিকে যাই। আবার কখনও নিচের থেকে টোকা খেয়ে চালকড়াইভাজা যেমন ওপরদিকে ছিটকে ওঠে, তেমনি করে নিচের থেকে কিসের একটা মস্ত বড় টোকা খেয়ে আসমানে ছিটকে উঠি। তখনই আবার নিচে পড়ে তেলের পিপের মতো গড়াগড়ি যাই। পোনেরো মিনিট এমনি বেসামাল কাণ্ড!
বলে নিঃশব্দে গম্ভীরভাবে মুন্না পকেট থেকে একটা কৌটা বের করলে। ধীরে সুস্থে, বেছে বেছে যেন একটি পছন্দমত বিড়ি বের করলে। সেটার মোটা দিকটায় জোরে জোরে কয়েকটা ফুঁ দিয়ে সরু প্রান্তটা দাঁতে চেপে ধরলে। তারপরে দেশলাই জ্বেলে তাতে অগ্নিসংযোগ করে নিশ্চিন্তে টানতে লাগল।
অর্থাৎ আমরা সেই ভাসা দমবন্ধ করা গরমের মধ্যে হাঁপাতে লাগলাম।
এখন বুঝছি, ওটা ওর গল্প বলার একটা কৌশল মাত্র। শ্রোতার আগ্রহ জাগিয়ে তোলবার কৌশল। ওতে ওর গল্প আশ্চর্য রকম জমে ওঠে। এবং ওর যে গল্প বলার অসামান্য শক্তি আছে, এরই মধ্যে আমরা তা টের পেয়ে গেছি। ও যেন আমাদের ওর সামনে এই মাটির সঙ্গে গেথে রেখেছে। সাধ্য নেই যে নড়ি।।
শুকননা গলায় বললাম, তারপরে?
উপর্যপরি কয়েকটা জোর টানে বিড়িটা শেষ করে ছুঁড়ে ফেলে দিলে। তারপর ধোঁয়া ছাড়তে ছাড়তে একটা অদ্ভুত ভঙ্গিতে আমাদের দিকে চাইতে লাগল। যেন আমাদের কথা ওর কানেই যায়নি।
আমাদের সকলেরই তখন ঠোঁট শুকিয়ে গেছে। অন্যমনস্কভাবে সবাই জিভ দিয়ে ঠোঁট ভিজিয়ে নিচ্ছি।
কতক্ষণ? কে জানে কতক্ষণ! মনে হল, যেন অনন্তকাল মুন্না সারেং নিঃশব্দে আমাদের দিকে চেয়ে আছে।
আমরাও তেমনি নিঃশব্দে ওর দিকে চেয়ে আছি। ওর কথাও যেন কোনোকালে শেষ হবে না, আমাদের বুকের কাঁপনও কোনোকালে থামবে না।
আবার জিজ্ঞাসা করলাম, তারপরে?
জিজ্ঞাসা নয়, যেন কথা দিয়ে ওকে একটা খোঁচা দিলাম। সেই খোঁচা খেয়ে ও যেন এবার সচেতন হল। গল্পের কথায় ফিরে এল আবার।
বললে, পোনেরো মিনিট এমনি ধস্তাধস্তি চলল বাবুসাহেব, কোন দুশমনের সঙ্গে কে জানে! হঠাৎ এক সময় মনে হল জাহাজটা যেন একটা চড়ায় আটকে গেল।
কোন্ চড়ায়?
তা কি আমরা কেউ বুঝতে পারছি বাবুসাহেব! দিনের বেলা, অথচ অন্ধকার। জাহাজের বিজলী বাতি জ্বলছে, কিন্তু তার রোশনাই জাহাজের বাইরে পৌছুচ্ছে না। যেমন অন্ধকার, তেমনিই অন্ধকার। কি করে বুঝব, কোথায় এলাম, কোন্ চরে আটকাল আমাদের জাহাজ। কেবল আটকাল যে, সেইটাই মালুম হল।
তারপরে? তারপরে বল।
মুন্না বলতে লাগল ।
চোঙ দিয়ে কাপ্তেন হুকুম দিলেন হুঁশিয়ার। আমরা হুঁশিয়ার হলাম। সঙ্গে সঙ্গে কাপ্তেন আবার কুম দিলেন : তোপ দাগ।
তিন ইঞ্চি মুখের তোপ ফিট করাই ছিল। সঙ্গে সঙ্গে আওয়াজ হল, একবার, দুবার। কী ভয়ঙ্কর আওয়াজ! মনে হল যেন আমাদেরই তাক করে ছোঁড়া হয়েছে।
আমি তো বেহুঁশ হয়ে পড়ে গেলাম। আরও অনেকেও।
যখন জ্ঞান হল, দেখি ঝক ঝক করছে সূর্য। আঁধারের চিহ্নমাত্র নেই। আর সামনের দরিয়ার পানি লাল টকটক করছে! পেছনে চেয়ে দেখি, আধখানা পেন্নাই তিমি মাছ ভাসছে।
তিমি মাছ! -আধখানা!
আমরা প্রায় চিৎকার করে উঠলাম। মুন্না বললে, তোপে লেজটা উড়ে গেছে।
আমরা ব্যাপারটা ঠিক বুঝতে পারছিলাম না। হঠাৎ তিমি মাছই বা এল কোথা থেকে, তার লেজটাই বা তোপে উড়ল কেন? সবই কেমন হেঁয়ালি বোধ হচ্ছিল।
এবং কিছুই বুঝতে না পেরে বোকার মতো পরস্পরের মুখের দিকে চাইতে লাগলাম।
বুঝতে পারলেন না বাবুসাহেব?—মুন্না সারেং আমাদের মুখের অবস্থা দেখে জিজ্ঞাসা করলে।
আমাদের বিমূঢ় ভাবটা তখনও কাটেনি। কথা বার হচ্ছিল না। শুধু ঘাড় নেড়ে জানালাম, না। চার পয়সার আইস-কিরিম খাওয়ান বাবু, বলছি। গলাটা শুকিয়ে গেছে।
একটা আইসক্রিমওয়ালা কখন যে আমাদের পিছনে বসে আমাদেরই মতো হাঁ করে গল্প গিলছিল, কেউ খেয়াল করিনি। মুন্না সারেং-এর কথা শোনামাত্র সে নিজে থেকেই একটা আইসক্রিম বের করে তার হাতে দিলে।
তারপর সবিনয়ে মুন্নাকে জিজ্ঞাসা করলে, লেকিন তিমি মছলি...
মুন্না পরিতোষের সঙ্গে আইস-ক্রিমটা লেহন করে সংক্ষেপে বললে, ওরই পেটের মধ্যে জাহাজ-শুদ্ধ আমরা ঢুকে পড়েছিলাম।
এবারে কাপ্তেন নয়, মুন্না সারেং নিজেই যেন একটা তোপ দাগলে। মুহুর্তকাল আমরাও বিমূঢ় হয়ে পড়লাম। তারপরেই কল্যাণ হো হো করে হেসে উঠল। সেই সঙ্গে আমরাও।
হাসি থামলে আইস-ক্রিমওয়ালাকে বললাম, আমাদেরও একটা করে আইস-ক্রিম দাও তো। কত দাম হচ্ছে বল।
দাম লাগবে না বাবুজি। খান একটা করে সবাই। সারেং সাহেব বহুং উমদা কেচ্ছা বলিয়েছে।
তারও ঠোটের ফাঁকে ফাঁকে হাসি। কিন্তু সে অন্য হাসি, আমাদের মতো অবিশ্বাসেরও নয়, বিশ্বসেরও নয়। অন্য। রসিকের হাসি বলা যেতে পারে।
ছবি: প্রতুলচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায় (সৌজন্য: জয়যাত্রা বার্ষিকী)


2 comments:

  1. বেশ লাগল পড়ে, আপনাকে অনেক ধন্যবাদ...

    ReplyDelete