Thursday, 1 January 2015

গল্প (মোঃ ভাঃ): রয়্যাল বেঙ্গলের মুখোমুখি

রয়্যাল বেঙ্গলের মুখোমুখি
শিশির বিশ্বাস
বেশ কয়েক বছর আগের কথা। ছোটখাটো একটা চাকরী নিয়ে বছরখানেক হল দণ্ডকারণ্যে গিয়েছি। পোস্টিং পড়িয়াতে। পড়িয়া মালকানগিরি জোনের এক আদিবাসী গ্রাম। যে সময়ের কথা বলছি দণ্ডকারণ্য প্রজেক্টের কাজ তখন পড়িয়াতে সবে শুরু হয়েছে। চারপাশে দুর্ভেদ্য জঙ্গল আর পাহাড়। মাইলের পর মাইল শুধু কেন্দুপাতার গাছ। সেই সাথে মহুয়া, সেগুন, বিশাল আর সাজার জঙ্গল। সে জঙ্গল জায়গায় জায়গায় এত ঘন যে, দিনদুপুরেও সূর্যের আলো ঢোকে না। এই পড়িয়ার পাশ দিয়ে বয়ে চলেছে ছোট একটি পাহাড়ি নদী। ভারি সুন্দর নাম সবেরু।
সেবার অফিসের একটা কাজে জগদ্দলপুর গিয়েছিলাম। ফেরার দিন মালকানগিরি পৌঁছুতে রাত্তির প্রায় নটা বেজে গেল। মালকানগিরি থেকে পড়িয়ায় দূরত্ব পঁচিশ মাইলের মতো। কিন্তু মুস্কিল, সে সময় এ পথে কোন বাস চলত না। মালবাহী ট্রাক কিংবা জিপই ছিল ভরসা। সুতরাং রাস্তার মোড়ে এসে দাঁড়ালাম। মনে অবশ্য সন্দেহ ছিল এত রাত্তিরে এপথে তেমন কিছু মিলবে কিনা। উঁচুনিচু পাহাড়ি রাস্তা। পুরো পথটাই গেছে গভীর জঙ্গলের ভিতর দিয়ে। দিনের বেলাতেও অনেক ড্রাইভার গাড়ি চালাতে সাহস পায় পায়।
অপেক্ষা করে করে প্রায় দশটা নাগাদ যখন ভাবছি রাত্তিরটা কাটাবার জন্য কোথায় ওঠা যায়, এমন সময় প্রজেক্টের একটা জিপ পেয়ে গেলাম। হাত তোলার আগেই জিপটা আমার পাশে দাঁড়িয়ে গেল। ড্রাইভারের পাশে বসা A. E. O. মিঃ সমাদ্দারের গলা শুনলাম, ‘উড সাহেব যে! কী সন্দেশ?’
দণ্ডকারণ্যের এই দূরদেশে কর্মরত বাঙালির সংখ্যা তখন কম নয়। তার উপর ওপার বাংলা থেকে আসা উদ্বাস্তু মানুষের ক্যাম্প। কাজের ফাঁকে সামান্য আনন্দের খোঁজে কর্মরত বাঙালিরা প্রতি বছর নাটকের আয়োজন করত। সন্ধের পর রিহার্সাল তারপর নির্দিষ্ট দিনে হইহই করে অভিনয় কয়েকটা দিন বেশ কেটে যেত। সেবার আমি যাওয়ার পর নাটক হয়েছিল ‘নীলদর্পণ’। তাতে উড সাহেব ছিলাম আমি। সমাদ্দারবাবু নবীনমাধব। সেই থেকে উনি মাঝেমধ্যেই আমাকে ঐ নামে ডাকতেন। বেশ রসিক মানুষ। চেহারাটাও দেখবার মত। ভাল শিকারি হিসেবেও নাম করেছিলেন। বলা বাহুল্য, উনি আমাকে জিপে তুলে নিলেন।
মালকানগিরি টাউনের চৌহদ্দি পেরিয়ে জীপ একটু বাদেই ঢুকে পড়ল জঙ্গলের ভিতর। পথের দু’পাশে ঘন জঙ্গলে চাপ চাপ অন্ধকার। অবিশ্রান্ত ঝিঁঝির কোরাস। ক্বচিৎ দু'একটা রাতজাগা পাখির কর্কশ আওয়াজ। আমার ডান পাশে ড্রাইভারের সীটে বসে পিল্লাই ভীষণ গম্ভীর ভাবে গাড়ি চালাচ্ছে। ড্রাইভিংয়ে পিল্লাইয়ের হাত মন্দ নয়। কিন্তু এ অঞ্চলে আমার মতই নতুন। আমার বাঁ দিকে সমাদ্দারবাবু দিব্যি খোশমেজাজে একটার পর একটা সিগারেট ধ্বংস করতে করতে কী একটা গানের কলি ভাঁজছেন।
পাহাড়ি পথ। কোথাও মসৃণ কোথাও এবড়ো খেবড়ো। এক এক জায়গায় বিপজ্জনক ভাবে বাঁক নিয়েছে। এই পথের মাঝখানে পড়ে শিকাপল্লী নামে ছোট এক আদিবাসী গ্রাম। গ্রাম পার হলেই জঙ্গল আরও গভীর। শিকাপল্পী পেরিয়ে আমরা তখন বোধ হয় মাইল দুই এসেছি। হঠাৎ বাঁ-দিকের জঙ্গল থেকে গোটা কয়েক চিতল হরিণ টাউ টাউ রবে তীর বেগে রাস্তা পার হয়ে ডান দিকের জঙ্গলে ছুটে পালাল। জিপের হেডলাইটের তীব্র আলোয় ওদের কালচে বুটি দেওয়া চকচকে শরীরগুলো মুহূর্তের জন্য ঝিলিক দিয়ে উঠল।
দণ্ডকারণ্যে প্রায় বছর খানেক রয়েছি। হরিণ দেখলে এখন আর তেমন রোমাঞ্চ জাগে না। কিন্তু হঠাৎ দেখলাম ড্রাইভার পিল্লাই কেমন যেন চঞ্চল হয়ে উঠেছে। বার কয়েক ঘন ঘন নিঃশ্বাস টেনে তার ভাঙা হিন্দিতে বলল, ‘সার, শের হায়! শেরকা স্মেল।
দণ্ডকারণ্যে এসে এ পর্যন্ত আমি বাঘ দেখিনি। পিল্লাইয়ের কথায় কেমন সন্ত্রস্ত হয়ে উঠলাম। মৃদু হলেও একটা বোটকা গন্ধ আমিও পাচ্ছিলাম! বাঘ তবে কাছে পিঠেই রয়েছে। হরিণগুলো ওই কারণেই ছুটে পালাল!
সমাদ্দারবাবু কিন্তু নির্বিকার। সামান্য হেসে বললেন, 'ডোন্ট ওরি, পিল্লাই। স্পীড বাড়িয়ে দাও।’
সেকেন্ড গিয়ারে গাড়ি চলছিল। ক্লাচ দিয়ে খট খট শব্দে সেটা টপ গিয়ারে ঠেলে দিল পিল্লাই। গোঁ গোঁ করে জিপ ছুটল। আর তারপর মিনিট খানেকও হয়নি, কাঁ–আঁ–ক করে আচমকা ব্রেক কষে দাঁড়িয়ে গেল।
ব্রেকের ধাক্কায় প্রায় হুমড়ি খেয়ে পড়েছিলাম। কোনোক্রমে সামলে নিয়ে মাথা তুলতেই হেডলাইটের আলোয় উইন্ড–স্ক্রিনের ভিতর দিয়ে যে দৃশ্য চোখে পড়ল তাকে শিরদাঁড়ার ভিতর দিয়ে একটা হিমেল স্রোত বয়ে গেল। সামান্য দুরে রাস্তার উপর দাঁড়িয়ে প্রকাণ্ড এক রয়্যাল টাইগার, হেডলাইটের তীব্র আলোয় তার ভাঁটার মত চোখদুটো জ্বলজ্বল করছে। সামনেই পড়ে রয়েছে বেশ বড় একটা সম্বর। একটু আগেই শিকারটা ধরা হয়েছে। রাস্তার উপর ফেলে সদগতি শুরু করার মুখেই আমাদের আবির্ভাব।
জিপের এত কাছে অত বড় একটা বাঘ দেখে, বলা বাহুল্য, আমার নিঃশ্বাস তখন বন্ধ হয়ে গেছে। বাঁ পাশ থেকে সমাদ্দারবাবু কনুইয়ের মৃদু ঠেলা দিয়ে বললেন, ‘দারুণ লাকি মশাই আপনি! বছর দশেক দণ্ডকারণ্যে আছি, এত বড় রয়্যাল বেঙ্গল টাইগার এর আগে দেখিনি।’
জবাব দেওয়ার মত অবস্থায় তখন নেই। ভদ্রলোক আমাকে ভাগ্যবান বলছেন। কিন্তু আমার কাছে তখন দুর্ভাগ্যটাই যেন অনেক বেশি স্বস্তিদায়ক হত। এই রাতে ঘন নির্জন অরণ্যের মাঝে আমরা তিনটি মাত্র প্রাণী। সম্পূর্ণ নিরস্ত্র। সামনের উইন্ড–স্ক্রিন বাদ দিলে জিপের দু’পাশের দরজাই সম্পূর্ণ খোলা। খোলা ক্যারিয়ারের পিছনদিকও।
কয়েক মুহূর্ত নিস্তব্ধতার পর পিল্লাই ঘাড় ফেরাল। দারুণ নার্ভাস হয়ে পড়েছে বেচারা। কোনও ক্রমে বলল, ‘আভি কেয়া হোগা সার ?’
সমাদ্দারবাবু বাঘটার উপর থেকে চোখ না সরিয়ে বললেন ‘ঘাবড়িও না পিল্লাই। ডান দিক দিয়ে পাশ কাটিয়ে বেরিয়ে যাও।’
বাঘটা প্রায় রাস্তার মাঝখানে সদ্য শিকারের সামনে দাঁড়িয়ে। ডান দিক দিয়ে পাশ কাটালে বাঘটা সমাদ্দারবাবুর দিকেই পড়বে। পিল্লাই তৎক্ষণাৎ গিয়ার দিয়ে অ্যাকসিলেটারে চাপ দিল। বাঘটা এতক্ষণ পর্যন্ত কোনও সাড়াশব্দ করেনি। কিন্তু জিপটা সামান্য এগোবার উপক্রম করতেই দারুণ বিরক্তিতে চাপা গর্জন করে উঠল। ঘ–র–র–র…
নিস্তব্ধ অরণ্যের মাঝে সেই গর্জন প্রায় বাজ পড়ার মত শোনাল। তীব্র আলোয় বাঘটার তাজা রক্তমাখা মুখের ভিতর একরাশ তীক্ষ্ণ দাঁত ঝকমকিয়ে উঠল। মুহূর্তে মনে হল আমি বোধ হয় নেই। মরেই গেছি। হৃৎস্পন্দন চিরকালের মত থেমে গেছে। আতঙ্কে চোখ বুজে ফেললাম।
ওদিকে পিল্লাই ততক্ষণে গিয়ার রিলিজ করে ফেলেছে। কাঁপা গলায় বলল, ‘হো–হোগা নাই সার।’
বেচারা তখন সত্যিই ভীষণ নার্ভাস হয়ে পড়েছে। ওর অবস্থা অনুমান করে সমাদ্দারবাবু বললেন, ‘তুমি এদিকে এসো দেখি। আমি ড্রাইভিং সীটে বসছি।’
পিল্লাই কিছুমাত্র আপত্তি করল না। নামার প্রশ্নই আসে না। জিপের ভিতরে অনেক কসরৎ করে জায়গা বদল করে নেওয়া হল। মুশকিল হয়ে গেল আমার। এতক্ষণ মাঝখানে ছিলাম। এবার চলে এলাম বাঁ-দিকে খোলা দরজার পাশে। পিল্লাই মাঝখানে। সমাদ্দারবাবুও কী রাস্তার ডান ধার দিয়ে পাশ কাটাবেন? রাস্তা যা চওড়া জিপ ডানদিকে যত ঘেঁসেই যাক খোলা দরজা থেকে বাঘের দূরত্ব ফুট খানেকও থাকবে না। ইচ্ছে করলে এক থাবায় পেড়ে ফেলতে পারে। বুকের ভিতরে হঠাৎ হাতুড়ির আওয়াজ শুরু হয়ে গেল। তারই ভিতর গাড়ি স্টার্ট করলেন উনি।
বুঝি কয়েক গজও এগোয়নি বাঘটা চাপা গর্জনেই ক্ষান্ত হল না, শিকার ছেড়ে গজরাতে গজরাতে কয়েক পা এগিয়ে এলো গাড়ির দিকে।
ব্যাপার দেখে এবার সমাদ্দারবাবুও প্রমাদ গণলেন। ব্যাক গিয়ার দিয়ে খানিক পিছিয়ে আনলেন গাড়ি। এতক্ষণে দেখলাম উনিও যেন কিছু বিচলিত। স্টিয়ারিংয়ের উপর হাত রেখে বলেন, 'এ তো বেশ ঝামেলা হল মশাই। ব্যাটার ধারণা হয়েছে আমরা ওর শিকারে ভাগ বসাতে চাইছি।’
আমি ঢোঁক গিয়ে বলতে যাচ্ছিলাম ‘চলুন মালকানগিরি ফিরে যাই বরং।’ কিন্তু বলা হল না, হঠাৎ সমাদ্দারবাবু তীব্র আওয়াজে হর্ন বাজাতে শুরু করলেন। হেডলাইট দুটোর আলো আরও চড়িয়ে দিয়ে ধীরে ধীরে সামনে এগোতে লাগলেন।
জিপটাকে পিছিয়ে যেতে দেখে বাঘটা থেমে গিয়েছিল। এবার এগিয়ে আসতে দেখে ফের গজরাতে শুরু করল। তবে হর্নের আওয়াজেই হোক বা অন্য কারণে বাঘটা আর জিপের দিকে এগোচ্ছিল না।  কানের কাছে হর্নের তীব্র শব্দে বাঘটার গর্জন তেমন শুনতে না পেলেও সেটা যে ক্রমশ বাড়ছে, তা বোঝা যাচ্ছিল প্রাণীটার মুখব্যাদানের বহর দেখে। লেজও অনেক দ্রুত নড়তে শুরু করেছে। বাড়িতে একটা পোষা বিড়াল ছিল। অনেক দিন দেখেছি শিকারের ঘাড়ে লাফিয়ে পড়ার আগে এই ভাবেই তার লেজ নড়ত।
কী যে ঘটতে চলেছে কিছুই তখন বুঝে উঠতে পারছি না। শুধু মনে হচ্ছে গোঁয়ারগোবিন্দ সমাদ্দারবাবু আজ কিছু একটা না ঘটিয়ে ছাড়বেন না। আর সেই অঘটন আমার উপর দিয়েই যাবে হয়তো। হায়! হায়!
চরম উৎকণ্ঠায় প্রায় কাঠ হয়ে গেছি তখন। এমন সময় এক ব্যাপার ঘটল। আমাদের গাড়ি তখন বাঘটার কয়েক গজের মধ্যে পৌঁছে গেছে। হঠাৎ সামনে পথের বাঁকে এক ঝলক তীব্র আলো এসে পড়ল। মুহূর্তের মধ্যে ওদিক থেকে হর্ন দিতে দিতে বাঁকের আড়াল থেকে বেরিয়ে এলো একটা অ্যাম্বুলেন্স। আর তাতেই গোটা পরিস্থিতি পাল্টে গেল। হঠাৎ পিছন থেকেও তীব্র আলো আর হর্নের আওয়াজে বাঘটা ভয়ানক ঘাবড়ে গিয়ে একবার পিছনে তাকিয়েই শিকারটা মুখে তুলে নিয়ে ঢুকে গেল বাঁ দিকের জঙ্গলে। আর দেখা গেল না।
ব্যাপাটা এমন হঠাৎ ঘটে গেল যে‚ আমাদের সবার তখন প্রায় হতবুদ্ধি অবস্থা। ইতিমধ্যে সামনের অ্যাম্বুলেন্সটা পাশে এসে দাঁড়িয়েছে। ব্যাপারটা অ্যাম্বুলেন্সের ড্রাইভারেরও নজর এড়ায়নি। প্রজেক্টেরই অ্যাম্বুলেন্স। মুমূর্ষু এক পেশেন্ট নিয়ে চলেছে ১৯ নং ভিলেজ হসপিটালের দিকে। সামান্য বাক্যালাপের পর বেরিয়ে গেল ওরা। সামনে ফাঁকা রাস্তার দিকে চোখ রেখে জিপ চালাতে চালাতে সমাদ্দারবাবু বললেন 'কেমন দেখলেন উড সাহেব?’
একটু কাষ্ঠ হেসে বললাম ‘যা দেখলাম জীবনে আর দেখতে চাই না। এই মুহূর্তে শুধু কামনা ওই অসুস্থ মানুষটি ভাল হয়ে উঠুন।’

ছবি: দেবাশীষ দেব (সৌজন্য: সন্দেশ)



2 comments:

  1. Interesting laglo, kobe beriyechilo golpo ti Sandesh e?

    ReplyDelete
    Replies
    1. গল্পটি ‘সন্দেশ’ ফেব্রুয়ারি ১৯৮৩ সংখ্যায় প্রকাশিত হয়েছিল। দুর্ভাগ্য আমার সংখ্যাটি অনেক দিন হারিয়ে গেছে। এমনকী মূল লেখাটিও সন্ধান নেই। হারিয়ে গেছে কোনো খাতার ভিতর। পুরোনো সন্দেশ থেকে লেখাটি উদ্ধার করে পাঠিয়েছে সমুদ্র বসু।
      গল্পটি শুনেছিলাম পরিচিত এক প্রত্যক্ষদর্শীর কাছে।

      Delete