Thursday, 22 January 2015

সুন্দরবনের গল্প (মোবাইল ভার্শন): গর্জনের দিন

গর্জনের দিন
শিশির বিশ্বাস
সুর্য তখন মাথার উপর থেকে পশ্চিম আকাশে ঢলতে শুরু করেছে। বাদায় গরাণ, বাইন আর হেঁতালের ঘন অরণ্যের অন্ধকার এখন অনেকটাই হালকা। মস্ত এক কাঁকড়া গাছের গোড়ায় সন্তর্পণে কুড়ুল চালিয়ে চলেছে দুটো মানুষ। উঁচুমানের কাঠ পাওয়া যায় বাদার এই গাছ থেকে। বনদপ্তরের নজর এড়িয়ে তাই এক ফাঁকে বনে ঢুকে পড়েছে এরা। ঝিমধরা নির্জন বনের ভিতর তাই এখন কুড়ুলের খট-খট শব্দ। সন্তর্পণে হলেও দ্রুতই কাজ করে চলেছে মানুষগুলো। একটু পরেই ডালপালা নিয়ে ভেঙে পড়বে মস্ত গাছটা। খানিক দূরে তাই প্রস্তুতি নিচ্ছিল অন্য আর একজন।
গাঢ় হলুদের উপর কালো চমৎকার ডোরাকাটা প্রাণীটার একটু আগেও অবশ্য লক্ষ  ছিল ভিন্ন। গত চার দিন শিকার জোটেনিস্রেফ জল খেয়ে কেটেছে। সে জলও নোনা। তবে এসব গা-সওয়া ব্যাপার ওদের। আসল ব্যাপার হল বাদার এই বনে বেঁচে থাকাটাই বড়ো কষ্টের। এত বড়ো অরণ্য। তবু শিকার বেশ বাড়ন্ত। চোরাশিকারির আনাগোনা তো রোজকার ব্যাপার। হরিণ, শূকর তাই ক্রমশ কমে আসছে। তারপর বাদার এই বনে শিকার ধরার কাজটাও সহজ নয়। দলদলে নরম মাটি। ধারালো শূলো। সামান্য অসাবধান হবার জো নেই। বাদার হরিণ বা শূকরের সে দায় নেই। তাই শিকার একবার ফসকে গেলে সব বরবাদ। অনেক হিসেব করে এগোতে হয়। তাও বিফল হতে হয় মাঝেমধ্যেই । তখন বরাদ্দ সেই নদীর নোনাজল। আগে ভাঁটায় মজা শিস্-খালের কাদা-জলে দুএকটা মাছ পাওয়া যেত। সামান্য হলেও তাতে খিদে মিটত কিছু। কিন্তু সেসব এখন অতীতের ব্যাপার প্রায়। বাগদাপোনা ধরার জন্য গাঁ-গ্রামের মানুষ বছরকয়েক হল ছাঁকনি-জাল নিয়ে নেমে পড়েছে বাদার নদীনালায়। তাতে বাগদাপোনা যা ধরা পড়ে,তার হাজারগুণ মরে অন্য মাছের চারা।বাদার নদী-খালে তাই মাছের এখন বড়ো অকাল। পেটের খাবার জোটানোই ক্রমে কঠিন হয়ে পড়েছে। শিকারের সন্ধান পেলে তাই এখন আর কোনও ঝুঁকি নেয় না গর্জন। সেই ছোট বয়সে মা অনেক মেহনত করে শিখিয়ে দিয়েছিল সব। কোনও দিন বড়ো একটা হরিণ নয়তো শূকর মেরে এনে সামনে রাখত। তারপর দূর থেকে নিঃশব্দে পা টিপে এগিয়ে এসে কী করে ঝাঁপিয়ে পড়তে হয় শিকারের উপর, এক কামড়ে মটকে দিতে হয় ঘাড়, শিখিয়ে দিত সেইসব। অনেকক্ষণ ধরে চলত শেখানোর পালা। তারপর আয়েস করে খেতে বসত দুজন। নরম আর ভাল মাংস মা বরাদ্দ করে রাখত ওর জন্য। বড়ো ভালবাসত ওকে। চামটা দ্বীপের এক ঝাঁকড়া গর্জন গাছের তলায় ঝুরির মতো নেমে আসা গুচ্ছের শিকড়-বাকড়ের মাঝে চমৎকার এক আস্তানায় জন্ম হয়েছিল ওর। অনেকগুলো দিন কেটেছিল ওখানে। গর্জন নামটা মা তাই আদর করেই রেখেছিল। বড়ো চমৎকার ছিল দিনগুলো। প্রায় বছরদুয়েক। বেশ বড়োই হয়ে গেছে তখন। মা একাই শিকারে পাঠিয়ে দিত এক-একদিন। কোনও দিন মেরেও আনত কিছু। দুজন ভাগ করে খেত। তারপরই ঘটল সেই ব্যাপার। সেদিনও একাই শিকারে বেরিয়েছিল ও। দাঁতাল একটা শূকর শিকারও করে ফেলেছিল তাড়াতাড়ি। তারপর যথাস্থানে ফিরে দেখে মা নেই । শিকার ফেলে তারপর তন্নতন্ন করে ফেলেছিল সারা দ্বীপ। পায়নি কোথাও। বুঝতে বাকি থাকেনি, ওকে একা ফেলে মা চলে গেছে কোথাও। তারপর একে-একে কেটে গেছে অনেকগুলো বছর। গোড়ায় খুব কষ্ট হলেও মায়ের কথা এখন আর তেমন মনে পড়ে না। তবে মায়ের শেখানো শিকার ধরার সেই কায়দা-কানুনগুলো অক্ষরে-অক্ষরে মেনে চলে। ব্যাতিক্রম হয়নি আজও।
দুপুরের এই সময়টায় বাদার জঙ্গলে হরিণ বা শূকরের দল বিশ্রাম নেয়। বেরোয় না বড়ো একটা। ওরাও তাই কাটিয়ে দেয় শুয়ে-বসে। কিন্তু গত চার দিন শিকার জোটেনি। পেটের দায়ে তাই বেলাতেও শিকারের খোঁজে ক্ষান্তি দেয়নি আজ। নধরকান্তি হরিণটা নজরে পড়েছিল তারপরেই। বড়ো একটা কেওড়া গাছের নীচের দিকে গোটা কয়েক কচি ডালপালা বেরিয়েছে। দেখে আর লোভ সামলাতে পারেনি হরিণটা। পিছনের দুই পায়ে দাঁড়িয়ে উঁচু হয়ে দিব্যি ছিঁড়ে নামাচ্ছে কচি ডাল। তারপর মাটিতে ফেলে আয়েস করে চিবিয়ে খাচ্ছেদেখে আর সময় নষ্ট করেনি গর্জন। প্রথমেই বুঝে নিয়েছে বাতাসের দিক। বনের এই হরিণের দল বড়ো সতর্ক প্রাণী। প্রখর ঘ্রাণশক্তি। শত্রুর গায়ের গন্ধ বুঝে নিতে পারে খুব সহজেই। আর সামান্য সন্দেহ জাগলেই নিমেষে ছুটে পালিয়ে যায় ধরাছোঁয়ার বাইরে। তাই বাতাস যেদিক থেকে বইছে, কখনও সেদিক দিয়ে আক্রমণ করে না ওরা। আজ অবশ্য ভাগ্যটা ভালোই ছিল, উল্টো দিক থেকে আসছিল বাতাসটা। নইলে অনেকটা ঘুরে যেতে হত ওধারে। ততক্ষণে হয়তো খাওয়া শেষ করে সরে পড়ত প্রাণীটা।
 অযথা সময় নষ্ট না করে গর্জন এরপর নিঃশব্দে মাটির সঙ্গে প্রায় লেপটে পা টিপে একটু-একটু করে এগিয়ে গেছে শিকারের দিকে। হরিণটা বিন্দুমাত্রও আঁচ করতে পারেনি। তারপর অনেক হিসেব করে খানিক দূর থেকে শিকারের ঘাড়ে ঝাঁপিয়ে পড়ার সময়টিতেই ঘটল সেই ব্যাপার। হঠাৎ দূরে নদীর দিক থেকে ভেসে এল জনাকয়েক মানুষের আওয়াজ। আর তৎক্ষণাৎ হরিণটা এক লাফে অদৃশ্য হয়ে গেল গরাণ গাছের আড়ালে। মুহূর্তে ছুটে পালিয়ে গেল কোথায়।
     মানুষগুলো আর একটু দেরি করলেই এতক্ষণে হরিণটার গরম রক্তে গর্জন জিভ ভিজিয়ে নিতে পারত। চারদিন পরে পেট ভরাতে পারত টাটকা মাংসে। কিন্তু সেজন্য ও হতাশ হল না। ব্যর্থতায় ভেঙে পড়লে পেট ভরে না এখানে। বিন্দুমাত্র সময় নষ্ট না করে গা ঝাড়া দিয়ে উঠে ছুটল নদীর দিকে।
     খালের ধারে নৌকো বেঁধে মানুষগুলো ডাঙায় নেমে পড়েছে ততক্ষণে। দুজনের হাতে ধারালো কুড়ুল। বাকি একজনের হাতে দড়ির গোছা। এসেছে কাঠ কাটতে। অনতিবিলম্বে গর্জন পিছু নিল তাদের। খাল থেকে অল্প দূরেই বড়ো একটা কাঁকড়া গাছ। পছন্দ হতে দুজন দ্রুত কুড়ুল চালাতে শুরু করল গোড়ায়। দড়ি হাতে তৃতীয় মানুষটির আপাতত কাজ নেই। গাছ মাটিতে পড়লে ডালপালা ছেঁটে গোছানোর পালায় হাত লাগাবে। তিনজনের মধ্যে প্রথমেই এই তৃতীয় ব্যাক্তিটিকে শিকার হিসেবে বেছে নিয়েছিল গর্জন। তার কারণ অবশ্য এই নয় যে লোকটির হাতে কোনও অস্ত্র নেই। এটি সম্পূর্ণভাবেই তাৎক্ষণিক পছন্দ অপছন্দের ব্যাপার। আর একবার সেটি করে ফেলার পরে বিরাট কিছু না ঘটলে লক্ষ্য আর পালটায়  না ওরা। এমনও হয়েছে, দল বেঁধে চার-পাঁচ জন মধুর খোঁজে জঙ্গলে ঢুকেছে। শেষের মানুষটিকে তুলে নেওয়া যায় সহজেই। তবু গোড়াতেই শিকার হিসেবে বেছে নেওয়া মানুষটিকে সবার মাঝখান থেকে তুলে নিয়ে গিয়েছে। একেবারে শেষমুহূর্ত ছাড়া কেউ আঁচও করতে পারেনি। মা-ই শিখিয়ে দিয়ে গিয়েছিল এটা। লক্ষ্য আগে থেকে স্থির থাকলে অব্যর্থভাবে ঝাঁপিয়ে পড়া যায় শিকারের উপর। ঘাড়ের উপর কামড়ে ধরা যায় নিখুঁতভাবে। আক্রান্ত প্রাণীটির তখন কিছুই আর করার থাকে না। প্রাণবায়ু বেরিয়ে যায় কিছুক্ষণের মধ্যেই। তবে এজন্য সমস্যাও হয় অনেক সময়। আজ তেমনটাই হয়ে গেল। কপালের ফের বলা যায়। সামনে ছোট একটা গরাণ ঝোপের আড়ালে অনেক কসরতে প্রায় মাটির সঙ্গে লেপটে নিচু হয়ে ও তখন নিঃশব্দে পৌঁছে গেছে শিকারের অনেকটাই কাছে, লোকটা খানিক সরে দাঁড়াল হঠাৎএকটু পরে ফের স্থানত্যাগ করল। আসলে গাছের অনেকটাই তখন কাটা হয়ে গেছে। ঘুরে-ঘুরে ব্যাপারটা পর্যবেক্ষণ করছিল সে। হিসেবে তাই গোলমাল হয়ে যাচ্ছিল গর্জনের। তবু ঝাঁপিয়ে পড়ত হয়তো। কিন্তু বাদার অনেক দিনের অভিজ্ঞ নরখাদক জানে তাতে ঝুঁকি আছে। লক্ষ্যভ্রষ্ট হলে ফের শিকারটিকে কায়দা করার সময় নাও মিলতে পারে। দুই সঙ্গীর হাতে ধারালো কুড়ুল। সামলে ওঠার আগেই নেমে আসতে পারে মাথায়। সে অভিজ্ঞতা ওর আগে হয়েছে একবার। সাহসে বাদার এই মানুষগুলোও কম নয়। একশো ভাগ নিশ্চিন্ত না হওয়া পর্যন্ত গর্জন আরও কিছুক্ষণ অপেক্ষা করাই ঠিক করল। এ ব্যাপারে অসীম ধৈর্য বাদার নরখাদক বাঘের।
কিন্তু বাদায় বাঘের শত্রু তো কম নয় কিছুমিনিটকয়েক কেটে গেছে তারপর। নিঃশব্দে অপেক্ষা করছে গর্জন। উঁচুতে একটা সলুই উড়ে আসছিল খালের দিক থেকে,দুবার চক্কর মেরে ডেকে উঠল ব্যাঁ-ব্যাঁ করে।বাদায় লম্বা গলা আর ঠোঁটওয়ালা সলুইপাখি খাল বা নদীর অল্প জলে মাছ ধরে খায়। কাছে বাঘ বের হলে বা নজরে পড়লেই ডেকে উঠে উড়তে থাকে চক্রাকারে। বাদার অভিজ্ঞ মানুষ ব্যাপারটা জানে। হঠাৎ তাই সলুইটা ডেকে উঠতেই থমকে গেল তিনজন। সতর্ক চোখে দৃষ্টি ঘোরাতে লাগল চারপাশে। তারপর চোখ এসে আটকে গেল অদূরে সেই গরাণ ঝোপের কাছে। কী সর্বনাশ! এত কাছে ওঁত পেতে রয়েছে বাঘ, টেরটিও পায়নি কেউ!
হেই, খবরদার!নিমেষে কুড়ুল উঁচিয়ে চেঁচিয়ে উঠল মানুষগুলো। গাছ কাটা ফেলে প্রাণ বাঁচাতে পিছু হঠতে লাগল খালে নৌকোর দিকে।
ততক্ষণে গর্জনের বুঝতে বাকি নেই, হল না এবারেও। পেটে গত চার দিনের খিদের তাড়না। ছুটে গিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়াই যেত একজনের উপর। দুপায়ের এই মানুষগুলো হরিণের মত ছুটে পালাতে পারে না। শূকরের মতো ধারালো দাঁতও নেই। তবু অতিরিক্ত কী যেন একটা আছে! বাদার বাঘ তাই সবচেয়ে বেশি ভয় পায় এই মানুষকেই। সমীহ করে। সুযোগ থাকলেও সামনাসামনি কখনও আক্রমণ করে না। গর্জনও এগোল না। দাঁড়িয়ে নিষ্ফল আক্রোশে গজরাতে লাগল শুধু। গাল বেয়ে গরম লালা ছিটকে বের হতে লাগল। হাত-পা ছুঁড়ে চিৎকার করতে- করতে মানুষগুলো ওর চোখের আড়ালে চলে যেতেই গর্জন দেরি করল না। জঙ্গলে গা-ঢাকা দিয়ে ছুটল পিছনে। খালের ধারে যখন পৌঁছোল তখন চোখে-মুখে একরাশ আতঙ্ক নিয়ে মানুষগুলো নৌকো ছেড়ে দিয়েছে।
অন্য সময় হলে বাদার ক্ষুধার্ত বাঘ পিছু নিত। কখন আরোহীরা ফের জঙ্গলে নামবে সেই অপেক্ষায় থাকত। নৌকোর মানুষগুলো জানতেও পারত না। কিন্তু গর্জন জানে, এক্ষেত্রে তা আর হবার নয়, আতঙ্কিত মানুষগুলো এরপর আর জঙ্গলে নামার ঝুঁকি নেবে না। একেবারে গ্রামে গিয়ে থামবে। খিদেটা চাপা দিতে খালে মুখ দিয়ে অনেকটা নোনাজল খেয়ে নিল ও। তারপর পাশেই একটা বড়ো হেঁতাল ঝাড়ের তলায় শুয়ে পড়ল চার পা গুটিয়ে। একটু আগে যা হইচই হল, এরপর হাজার দরকারেও এই বেলায় হরিণ বা শূকর বের হবে না।
 তারপর কেটে গেছে অনেকটা সময়। শুয়ে ঘুমিয়েই পড়েছিল গর্জন। হঠাৎ দাঁড়ের হালকা ছপ-ছপ শব্দে ঘুম যখন ভাঙল বিকেল তখন ঘন হতে শুরু করেছে। একটা নৌকো চলেছে সামনে খাল দিয়ে। জনাতিনেক মানুষ ভিতরে। তবে জাল বা মাছ ধরার সরঞ্জাম কিছু নেই। দেখেই গা ঝাড়া দিয়ে উঠে দাঁড়াল গর্জন। সন্দেহ নেই এই বিকেলে দেশি বন্দুক নিয়ে হরিণ শিকারে এসেছে। নয়তো কাঠ কাটতে। নামবে এখুনি। নৌকোর সামনের দিকে দাঁড় বাইতে থাকা মোটাসোটা মানুষটির দিকে নজর পড়তে পেটের চাপা খিদেটা ফের হু-হু করে উঠল ওর। খালের পাড়ে জঙ্গলের আড়াল দিয়ে পিছু নিল নিঃশব্দে।
বাদার বাঘ এভাবে একবার কোনও নৌকোর পিছু নিলে সহজে ক্ষান্ত হয় না। সুযোগের অপেক্ষায় অসীম ধৈর্যে এগিয়ে চলে মাইলের পর মাইল । দরকারে সাঁতরে পার হয়ে যায় নদী। ক্লান্ত হয় না কখনও। কিন্তু গর্জনের ভাগ্য আজ বিরূপ ছিল বোধহয়। টানা প্রায় ঘন্টা আড়াই নৌকোটাকে অনুসরণ করার পর হুঁশ হতে বেচারা বুঝতে পারল, ব্যর্থ হয়েছে এবারের চেষ্টাও। খাল বেয়ে নৌকো খানিক আগেই এসে পড়েছিল রাঙাবেলিয়া গাঙে। ওপারে সাতজেলিয়ার আবাদ। জঙ্গল ছেড়ে নৌকো এবার চলছে সেই দিকে। জঙ্গলে আজ আর নামবে না কেউ।
শীতের বিকেলের আলো ইতিমধ্যে পড়ে এসেছে অনেকটাই। সন্ধে নামতে দেরি নেই বিশেষ। মস্ত একটা বুনো হাঁসের ঝাঁক দিনশেষে উড়ে চলেছে গ্রামের কোনও চাষের খেতে রাতের আস্তানার খোঁজে। অনেক দূরে নৌকোর দিকে তাকিয়ে বিফল আক্রোশে জিব চাটছিল গর্জন। হঠাৎ সেই ঝাঁকের দিকে চোখ পড়তে অনেক দিন আগের একটা ঘটনা মনে পড়ে গেল। সে-ও এমনই এক শীতের  শেষের সন্ধে। শিকারের সন্ধানে ঘুরে বেরাচ্ছে। হঠাৎ ভয়ানক এক আওয়াজে চমকে উঠেছিল ভীষণ। এমন অদ্ভুত আর ভারি আওয়াজ সে কখনও শোনেনি। গোড়ায় ঘাবড়ে গেলেও খানিক এগোতেই মালুম হয়েছিল ব্যাপারটা। অদূরে এক খালের জলে দিনের শেষে আস্তানা নিয়েছে বুনো হাঁসের দল। সংখ্যায় হাজারকয়েক। কতক খালের পাড়ে কাদায় বসে রয়েছে। হঠাৎ কোনও কারণে ভয় পেয়ে পাখা ঝাপটাচ্ছে এক সাথে। আওয়াজের কারণ সেটাই। সেদিন সন্ধেয় গোটা কয়েক হাঁস দিয়ে দিনের খাওয়াটা সেরে নিয়েছিল ও। পরের দিন অবশ্য আর দেখা যায়নি ওদের। চলে গিয়েছিল অন্য কোথাও।
আকাশে হাঁসের দলটাকে দেখে পুরোনো সেই দিনের কথা মনে পড়তে আরামে আর একবার জিব চাটল গর্জন। আর তারপরেই ফের ফিরে এল বাস্তবে। নৌকোর পিছনে ধাওয়া করতে গিয়ে কখন পেরিয়ে গেছে বিকেল। রাতের খাওয়া শেষ করে হরিণের দল অনেকেই এতক্ষণে ঢুকে পড়তে শুরু করেছে যে যার আস্তানায়। অর্থাৎ আজও কিছু পেটে পড়ার সম্ভাবনা নেই। পর পর পাঁচ দিন। ভাবতে গিয়ে ওপারে গ্রামের আবছা রেখার দিকে তাকিয়ে হঠাৎ একটা মতলব খেলে গেল। এমন মতলব বারকয়েক আগেও মাথায় এসেছে। নদী পার হয়ে গ্রামে হানা দিলে কিছু না হোক, এক আধটা গরু-ছাগল পাওয়া যেতে পারে খুব সহজেই। পেট ভরিয়ে ফিরে আসা যায় জঙ্গলে। কিন্তু সাহস হয়নি। তাই আমলও দেয়নি। কিন্তু আজ পেটের ভিতরে খিদের যন্ত্রণাটা ফের মোচড় দিয়ে উঠতে দ্বিতীয়বার আর চিন্তা করল না গর্জন। সন্ধের অন্ধকার তখন ঘন হয়েছে আরও। নৌকোটা পৌঁছে গেছে ওপারে। আশপাশে দ্বিতীয় কোনও নৌকোও নেই। বিশাল রাঙাবেলিয়া গাঙে শুধু জোয়ারের ছলাৎ-ছলাৎ ঢেউ সাবধানে চারপাশে একবার চোখ বুলিয়ে নিঃশব্দে জলে নেমে পড়ল ও। বাদার এই  গ্রামগুলো আর পাঁচটা গ্রাম থেকে কিছু আলাদা। বর্ষায় তুফান, ভরা কোটালের জল আটকাবার জন্য নদী বরাবর মাটির উঁচু বাঁধ। বাঁধের গায়ে গরাণ আর বাইন গাছের সারি। শিকড়ের জটলা। ওপারে চাষের খেত। ঘরবাড়ি। বাদার গ্রামে চলাচলের প্রধান পথও এই বাঁধের উপর দিয়ে। নৌকোর ঘাটে পঞ্চায়েত থেকে আজকাল সোলার লাইটও এক-আধটা লাগানো হয়েছে। পাড়ার ছেলে-ছোকরাদের কেউ কেউ সেই সন্ধেয় আড্ডা জমায় সেখানে। বড়োরাও আসে দু একজন। সাতজেলিয়া আবাদে লাহিড়ীপুরের ঘাটে এমনই এক আড্ডার আসর সেদিন যেন কিছুতেই জমছিল না। ফুটফুটে জ্যোৎস্নায় ম-ম করছে চারপাশ। নদীর জলে রুপোলি ঝিলিক। মাঘের শেষ সপ্তায় শীতও আজ তেমন জাঁকালো নয়। তার উপর বিষয়বস্তুও ছিল যথেষ্ট। কুমিরমারির কয়েকজন দুপুরে জঙ্গলে কাঠ কাটতে গিয়ে আজ বাঘের মুখে পড়েছিল। কপাল জোরে বেঁচে ফিরেছে। তবু কেমন যেন তাল কেটে যাচ্ছে। ঘাটের পাশে অনাথের ছোটো এক দোকান। পেয়ারের দুটো কুকুর আছে ওর। দিনভর সামনে বসে থাকে হাঁ করে। সন্ধেয় আড্ডা জমে উঠলে দুটিতে চলে আসে এদিকে। দু-এক টুকরো বিস্কুটের আশায় ঘুরঘুর করে কাছ দিয়ে। তাদের কারও দেখা নেই। গাঁয়ের ওদিকে বড়ো বাঁশবনে এই সন্ধেয় কোরাস তোলে শেয়ালের পালপালটা রব ওঠে কুকুরের । আজ সব কেমন নিস্তব্ধ। থমথমে। আড্ডার আসরে আজ বয়স্ক ব্যক্তি ছিলেন বিষ্টু মন্ডল। অভিজ্ঞ মানুষ। গায়ের চাদরটা টেনে দিয়ে হঠাৎ উঠে পড়ে বললেন, “আজ আর ঘাটে বসে কাজ নেই কারও। ঘরে যা এবার।
ওদিকে অনাথও ততক্ষণে দোকান বন্ধ করতে শুরু করেছে। সুতরাং ভেঙেই গেল সন্ধের আড্ডাটা। উঠে পড়ে বিষ্টু মন্ডলের পিছু নিল সবাই। অল্প এগোলেই নদীর বাঁক। বাঁধের উপর রাস্তাও তাই বাঁক নিয়েছে। ফুটফুটে জ্যোৎস্নার আলোয় অভিজ্ঞ মানুষ বিষ্টু মন্ডলের চোখ সেই বাঁকের কাছে এসে হঠাৎ থেমে গেল। শুকনো মাটির উপর বাঘের পায়ের টাটকা দাগ। নদী থেকে উঠে বাঁধ পার হয়ে নেমে গেছে গ্রামের দিকে।
প্রায় বিদ্যুতের মতোই এর কিছুক্ষণের মধ্যে খবরটা রাষ্ট্র হয়ে গেল চারদিকে। আশপাশের পাঁচ-সাতটা গ্রামে। নদী পার হয়ে বাঘ ঢুকেছে লাহিড়ীপুরে। খবর গেল বনদপ্তরের অফিসেও। হাজার কয়েক মানুষ লাঠিসোঁটা, ক্যানেস্তারা নিয়ে নেমে পড়ল টহল দিতে।
জোয়ারের টান সামলে অত বড়ো রাঙাবেলিয়া গাঙ পার হতে গর্জনের মেহনত কম হয়নি। সামান্য জিরিয়ে নেবার জন্যই তাই গা-ঢাকা দিয়েছিল কাছেই বড়ো-বড়ো ঘাস আগাছায় ভর্তি এক পোড়ো জমিতে। খানিক দূরেই বেশ বড়ো একটা বাঁশবন। তবু পা বাড়ায়নি সেদিকে। ভেবেছিল একটু থিতু হলেই যত তাড়াতাড়ি সম্ভব কাজ হাসিল করে সরে পড়বে। কিন্তু একটু পরেই বুঝল তা বোধ হয় হবার নয়। সন্ধে রাতের নিঝুম গ্রাম হঠাৎ যেন ক্রমে সরগরম হয়ে উঠছে। কারণটা তখনও বুঝে উঠতে পারেনি বেচারা। তাহলে হয়ত তখনই বাঁধ পার হয়ে ফের নেমে পড়ত নদীতে। ফিরে যেত জঙ্গলে। কিন্তু যখন সেটা মালুম হল ততক্ষণে বন্ধ হয়ে গেছে সে পথ। হাজার-হাজার মানুষ লাঠিসোঁটা নিয়ে টহল দিচ্ছে বাঁধ বরাবর। ঘন-ঘন টর্চের জোরালো আলো ঝলসে উঠছে। উৎসাহে মশালও জ্বালিয়ে নিয়েছে কেউ। এ অবস্থায় এই আগাছার ঝোপে বেশিক্ষণ গা ঢাকা দিয়ে থাকা আর নিরাপদ নয় বুঝে গর্জন গা-ঝাড়া দিয়ে উঠেই ছুটল কাছেই সেই বাঁশবাগানের দিকে। তাতে বরং আরও গোলমাল হয়ে গেল। এতক্ষণ প্রাণীটার দেখা পায়নি কেউ। এবার সে-হদিশ মিলতেই হইহই শব্দে কয়েক হাজার মানুষ ছুটল পিছনে। কিছুক্ষণের মধ্যে খানিক দূর থেকে ঘিরে ফেলল বাঁশবাগান। ঘন-ঘন জোরালো টর্চের আলো এসে পড়তে লাগল ভিতরে।
বাদার দুর্দান্ত প্রাণীটা তার সুদীর্ঘ জীবনে প্রমাদ গুনল এই প্রথম। কদিনের অভুক্ত শরীরের ভিতর শুধু খিদের জ্বালা নয়, অন্য একটা ব্যাপারও এই প্রথম টের পেল ও। ভয় আর আতঙ্ক। বাদার জঙ্গলে এমন কখনও হয়নি। ফলে একটু-একটু করে সময় যত পার হতে লাগল, মাথার ভিতরে কেমন গুলিয়ে আসতে লাগল সব। তারই ভিতর এক এক সময় দেখতে পেল খানিক দূরে দাঁড়িয়ে বন্দুক হাতে একটা মানুষ। তাক করছে ওর দিকে। মানুষের হাতের আগুনে এই ভয়ানক অস্ত্রটা বিলক্ষণ চেনে গর্জন। মাথাটা যদিও কাজ করছিল না তেমন, তবু ট্রিগার টেপার মুহূর্তে সহজাত ক্ষমতায় লাফ দিল ও। পাশেই বাগানের ভিতর ছোটমতো একটা ডোবা। সেই দিকে।
গর্জনের পরমায়ু সেদিন সেই বাদার গ্রামেই শেষ হয়ে যেত হয়তো। কিন্তু হল না দুটো কারণে। এক তো বন্দুকটা আসলে ঘুমপাড়ানি বন্দুক। আর বনদপ্তরের যে মানুষটি সেটা ছুঁড়েছিলেন নিজের দায়িত্ব সম্পর্কে সতর্ক ছিলেন যথেষ্টই। গর্জন লাফ দিলেও ততক্ষণে তাঁর ছোঁড়া ওষুধ ভরা সিরিঞ্জ বন্দুক থেকে ছুটে নিঁখুত লক্ষ্যে ফুটে গেছে তার সামনের উরুতে। সেই অবস্থায় ও হুমড়ি খেয়ে পড়ল ডোবার জলে।
ঘুমপাড়ানি ওষুধের জন্য একেবারে মোক্ষম জায়গা বাঘের ওই সামনের উরু। কাজ করে অতি অল্প সময়ের ভিতর। কিন্তু জানা থাকলেও ঝুঁকি নেয় না কেউ। গোড়ায় দূর থেকে ঢিল ছুঁড়ে,তারপর লম্বা লাঠি দিয়ে খানিক খুঁচিয়ে দেখে নেওয়া হয় বাঘটা সত্যি-সত্যি অজ্ঞান হয়েছে কিনা। তারপর যাওয়া হয় কাছে। কিন্তু এক্ষেত্রে সেই সুবিধা ছিল না। দেরি করলে জলে শ্বাসরুদ্ধ হয়ে মারা যেতে পারে প্রাণীটি। তাতে গ্রামের মানুষের ক্ষতি নেই। কিন্তু টাইগার প্রজেক্টের একজন কর্মীর কাছে অভিপ্রেত নয়। সেদিন সেই মানুষটি অস্বীকারও করেননি সেটা। সঙ্গীরা ইতস্তত করছে দেখে মুহূর্তমাত্র সময় নষ্ট না করে হাতের বন্দুক ফেলে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন সেই ডোবার জলে। কাছে গিয়ে দারুণ সাহসে বাঘের বিশাল মাথাটা জল থেকে তুলে ধরেছিলেন অকুতোভয়ে।
গর্জনও এ-যাত্রায় বেঁচে গেল তাই। তখন ভোর হয়েছে সবে। হালকা কুয়াশা চাদর বিছিয়ে দিয়েছে বাদার নদীর জলে। রাতের হিম টপটপ করে ঝরে চলেছে  গরাণ আর বাইনের পাতা বেয়ে। সামনে বড়ো একটা চরা জমি। নরম মাটিতে ধানিঘাসের হালকা জঙ্গল। বনদপ্তরের একটা ভটভটি নৌকো দাঁড়িয়ে আছে কাছে। সামনে বড়ো মজবুত খাঁচা। গর্জনের ঘুম যখন ভাঙল তখন সেই খাঁচার ভিতর শুয়ে রয়েছে সে। সৎবিৎ ফিরে আসতে বেশিক্ষণ লাগল না অবশ্য। কয়েকমুহূর্ত মাত্র। তারপর এই অবস্থায় আর পাঁচটা বাদার বাঘ যা করে, গর্জনেরও তার ব্যাতিক্রম হল না। হুংকার দিয়ে উঠল মুহূর্তে। বাদার বাঘের সেই রক্ত জল করা গর্জন ভোরের ঝিম মেরে থাকা বনভূমি নিমেষে ভেঙে খানখান করে দিল। তারপর যখন বুঝল বন্দি হয়ে রয়েছে খাঁচার ভিতর, তখন তার রণহুংকার ক্রমশ বাড়তে শুরু করল আরও। আঁচড়ে কামড়ে ভেঙে ফেলতে চাইল খাঁচা। গত রাতের ব্যাপারটা তখন নিতান্ত এক দুঃস্বপ্ন ছাড়া কিছু নয়। অদূরে খাঁচার বাইরে পরিচিত সেই বাদার জঙ্গল দেখে মনের সেই জোর, শরীরের হারানো শক্তি ফিরে আসতে শুরু করেছে আবার। খাঁচার একধারে বড়ো একটা গামলা ভরতি খাওয়ার মিষ্টি জল। গর্জন তা ছুঁয়েও দেখল না। মুহুর্মুহু আঘাত করে চলল খাঁচার গায়ে।
কাছেই আরও একটা নৌকোয় আড়ালে বসে কয়েকজন তাকিয়ে দেখছিলেন বাঘটিকে। খাঁচায় বন্দি প্রাণীটির আচরণে কিছু অস্বাভাবিকতা লক্ষ করা যায় কিনা, তীক্ষ্ম  দৃষ্টিতে পর্যবেক্ষণ করছিলেন। খানিক বাদে নিশ্চিন্ত হতে তাঁদের ইঙ্গিতে অল্প-অল্প করে খুলে গেল খাঁচার দরজা। ব্যাপারটা বুঝতে যেটুকু সময় লাগল গর্জনের। তারপরই দ্রুত বের হয়ে এল বাইরে। কোনও দিকে না তাকিয়ে এক লাফে সামনের জল পার হয়ে ডাঙার উপর। ঢালু নরম মাটিতে পা হড়কে গিয়েছিল। কিন্তু সুনিপুণ দক্ষতায় সেটা সামলে নিয়ে ফের এক লাফে উঁচু ডাঙায়। তারপর এক ছুটে ফাঁকা জমিটা পার হয়ে জঙ্গলের ভিতর হারিয়ে গেল।
পেটের ভিতর গত পাঁচ দিনের খিদেটা ফের চাগাড় দিয়ে উঠতে শুরু করেছে। বাদার জঙ্গলে আর পাঁচটা বাঘের মতো গর্জনের আর একটা দিন শুরু হয়ে গেল আবার।
ছবি: প্রকাশ গুপ্ত

প্রথম প্রকাশ: ‘কিশোর ভারতী’ মার্চ ২০০

Wednesday, 21 January 2015

চেনা মাটি অচেনা মানুষ : সাতসকালে সুতোর খোঁজে




চেনা মাটি অচেনা মানুষ (মোবাইল ভার্শন) : বেলপাহাড়ির পথে

চেনা মাটি অচেনা মানুষের কথা:
বেলপাহাড়ির পথে
শিশির বিশ্বাস
 পাহাড় ঘেরা বেলপাহাড়ি। শুধু মাত্র পুব দিক ছাড়া যেদিকে তাকাও নজর আটকে যাবে দিগন্তের সীমারেখার কাছে ধুসর রঙের পাহাড়ে। পাহাড় আর জঙ্গল। অবশ্য বেলপাহাড়িতে পাহাড় নেই। উঁচু–নিচু ঢিপি আর বনবিভাগের তৈরি হালকা–পাতলা একটু জঙ্গল। লাল মোরামের রুখো মাটির দেশ।
বেলপাহাড়িতে প্রথম গিয়েছিলাম সেই আটের দশকের মাঝামাঝি। ফরেস্ট বাংলো বুক করে নিশ্চিন্তে বেরিয়ে পড়া। তবু তাল কেটে গেল গোড়াতেই। ঝাড়গ্রাম থেকে মাত্র চল্লিশ কিলোমিটার পথ। অথচ বিকেলের মধ্যে ঝাড়গ্রাম পৌঁছেও এই পথটুকু পাড়ি দিতে লেগে গিয়েছিল সাত ঘণ্টার উপর। অনিয়মিত বাস তখন এই পথে রোজকার ব্যাপার। সন্ধের পরে বাস যদিবা একটা পাওয়া গেল, ঝাড়গ্রামের চৌহদ্দি পেরোতেই হঠাৎ করুণ আর্তনাদে ব্রেকডাউন। কাছেই এক গ্যারেজ থেকে মিস্ত্রি ডেকে শুরু হল মেরামতির কাজ। ঘড়ির কাঁটা সাড়ে আটটার ঘর ছুঁতে চলেছে, কখন বাস চালু হবে ঠিক নেই। পথের দুই ধারে শুধু ফাঁকা মাঠ। তারই মাঝে দু’একটা বড় আকারের শাল–মহুলের গাছ। সেখানে গা ছমছম করা আরও জমাট অন্ধকার। এছাড়া নিশুতি রাতের অন্ধকারে চারপাশে শুধু ঝিঁঝির কোরাস। অন্ধকারে সেই পথের মাঝে কপালে যখন চিন্তার ভাঁজ পড়তে শুরু করেছে, নজরে পড়ল এক কোনে বাসের টিমটিমে আলোয় নানা বয়সের কয়েকটি আদিবাসী কচিকাঁচা মুখ। সবচেয়ে ছোটটির বয়স বছর ছয়েকের বেশি নয়। কাঁধে বই–খাতার ব্যাগ। সেই সকালে বাস ধরে ঝাড়গ্রামের স্কুলে পড়তে এসেছে ওরা। এখনও ঘরে ফেরা হয়নি। বোধহয় খাওয়াও জোটেনি তারপর। কিন্তু কারও মুখে ক্ষোভ–অভিযোগ নেই। দিব্যি নিশ্চিন্তে গল্প জুড়েছে। চলছে সেদিনের ক্লাসের পড়া নিয়ে আলোচনা। সত্যি, ওদের সেই মুখগুলো সেদিন কিছুটা হলেও স্বস্তি যুগিয়েছিল। প্রসঙ্গত এর দু’দিন পরে ফেরার পথের কথাও এই ফাঁকে সামান্য না বলে পারা গেল না। দু’দিন পরে রবিবার দুপুরে বাস ধরে ঝাড়গ্রাম ফিরছি। বিনপুর থেকে বছর চৌদ্দ বয়সের একটি ছেলে উঠল। পাশে এসে দাঁড়তে সরে সামান্য জায়গা করে দিয়েছিলাম। তারপরেই আলাপ। জানাল, বিকেলে ঝাড়গ্রামে ডিসট্রিক্ট টুর্নামেন্টের ফুটবল ম্যাচ। তাই দেখতে চলেছে। বিনপুর থেকে ঝাড়গ্রামের দূরত্ব কম নয়। আসবার দিনের অভিজ্ঞতার কথা মনে পড়তে বললাম, ‘খেলা দেখে কখন বাড়ি ফিরবে?’
ছেলেটি অম্লান বদনে বলল, ‘এদিকে বাসের অবস্থা ভাল নয় সার। রাত দশটা–এগারোটাও হয়ে যেতে পারে। তেমন হলে ঝাড়গ্রাম স্টেশনেও রাত কাটাতে হতে পারে।’
সামান্য ডিসট্রিক্ট টুর্নামেন্টের ম্যাচ। তাই দেখতে এমন ঝুঁকি! অবাক হয়ে সেই কথা বলতে ছেলেটি অম্লান বদনে বলল, ‘এসব ম্যাচ না দেখলে কী করে শিখব সার।’
ছেলেটি যে ফুটবল অন্ত প্রাণ, প্রকাশ পেতে দেরি হয়নি তারপর। খুব ইচ্ছে কলকাতার কোনও ফুটবল ক্লাবে খেলার। ওদের এদিকে ফুটবলারের খোঁজে কলকাতা থেকে কখনও স্পটার আসেন। যদি তাঁদের নজরে পড়া যায়, ছেলেটির চোখে সেই স্বপ্ন।
আগের প্রসঙ্গে ফিরে আসি আবার। সেদিন আমরাও বেলপাহাড়ি পৌঁছেছিলাম রাত প্রায় বারোটা নাগাদ। নিশুতি রাতে বাস থেকে নেমে অন্ধকার নির্জন বনপথ ধরে ফরেস্ট বাংলোর দিকে হাঁটার সময় নাকে আসছিল শুধু ইউক্যালিপ্টাসের গন্ধ। বেলপাহাড়ির বাতাসে ইউক্যালিপ্টাসের গন্ধই শুধু নয়, অন্য এক গন্ধও পাওয়া যায় কখনও। ব্যাপারটা জানা গিয়েছিল বৃদ্ধ বনমালি সোরেনের কাছে। ‘আর কদিন পরেই চৈত মাসে বাতাসে অন্য এক গন্ধ দিবে বাবু। সিটো মহুয়া ফুলের সময় বটে।’
বেলপাহাড়িতে মহুয়া গাছের অভাব নেই। চৈত্র মাস পড়লেই তাই গ্রামে গ্রামে সাড়া পড়ে যায়। প্রতিটি গাছের তলা ঝাঁট দিয়ে পরিষ্কার করে রাখা হয়। মহুয়া ফুলের আয়ু মাত্র একটি রাত। সন্ধেয় ফোটা ফুল সকালেই ঝরে যায়। তখন কুড়িয়ে নেবার পালা। মহুয়া ফুলের লোভে কাছে বাঁশপাহাড়ি আর কাঁকড়াঝোরের জঙ্গল থেকে তখন দু’একটা ভালুকও নাকি চলে আসে কখনও। 
মহুয়া, ইউক্যালিপ্টাস ছাড়াও বেলপাহাড়িতে আর রয়েছে সোনাঝুরি। এছাড়া শাল, সেগুন আর পিয়াল। এখানে ওখানে ডাঁই করা কাঠের পাহাড়। ভোর সকালে বাজারে এলেই নজরে পড়বে কাঠ বোঝাই হয়ে সার সার গরুর গাড়ি আসছে পাহাড়ের ওদিকে জঙ্গলের দিকে থেকে। জমা হচ্ছে মহাজনের গুদামে। আর রয়েছে বনমালি সোরেনদের গ্রামগুলো।
বনমালি সোরেনরা কালো মানুষ। অথচ ওদের ঝকঝকে ঘরবাড়িগুলো চোখে পড়ার মতো। নিখুঁতভাবে নিকানো মাটির দেয়াল, উঠোন মায় গোয়ালঘরটি পর্যন্ত। এই পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতা বোধ হয় ওদের মজ্জাগত। রবিবার ছুটির দিন। বেলপাহাড়ি আদিবাসী আবাসিক স্কুলের মেয়েদের দেখলাম হাতে ঝাঁটা, ঝুড়ি আর বালতি নিয়ে কাজে নেমে পড়েছে। শুধু স্কুলবাড়িই নয়, পরিষ্কার করে ফেলছে আশপাশের জমা জঞ্জালও। কলকাতা শহরেও হয়তো এমন দৃশ্য দেখা যায় কখনও। নামি কোনও স্কুল বা সংস্থার ছেলেমেয়েরা ঝকঝকে পোষাকে বুকে ব্যাজ আর হাতে পোস্টার, ব্যানার নিয়ে সহর সাফাইয়ে বের হয়। খবর দিয়ে আনা হয় রিপোর্টার আর ক্যামেরা ম্যান। পরের দিন দৈনিক পত্রিকায় ফলাও করে ছাপা হয় সেই ছবি। দেখানো হয় টিভির চ্যানেলে। সঙ্গে চটকদার ভাষ্য।
বেলপাহাড়ির গ্রামের পথে হাঁটলেই নজরে পড়বে উঁচু লম্বা গলা আর বেজায় লম্বা পায়ের কিছু অন্য জাতের মুরগি। চরে বেড়াচ্ছে গ্রামের পথে। কৌতূহলী হয়ে জিজ্ঞাসা করলে জানা যাবে লাল মাটির এই অঞ্চলের এক অতি জনপ্রিয় খেলা মোরগের লড়াইয়ের কথা। লম্বা গলা আর পা ওয়ালা এই জাতের মোরগ দারুণ লড়িয়ে। এদের কদর তাই এখানে ঘরে ঘরে। শীত পড়লেই শুরু হয় মোরগের লড়াই। হাটে, বাজারে কিংবা মাঠে–ময়দানে তখন সমানে চলবে এই খেলা। দুটো মোরগের লম্বা পায়ে তীক্ষ্ণ ছুরি বেঁধে ছেড়ে দেওয়া হবে। চারপাশে হরেক দর্শকের হইহই ভিড়। লড়াইয়ের হাল দেখে ওঠানামা করবে বাজির দর। লড়াই শেষে পরাজিত মোরগটি হবে বিজয়ী মোরগের মালিকের সম্পত্তি। এছাড়া মোট বাজির টাকার কিছু অংশ। এছাড়া বাজিতে যাদের জিত হল তাদের সহর্ষ জয়গান আর সাধুবাদ বাড়তি প্রাপ্য। আর যে মোরগের হার হল, তার মালিক লজ্জায় মুখ লুকোবেন। বাজিতে যাদের হার হয়েছে, তাদের টিটকিরি আর কটু কথা তো আছেই।
ঝাড়গ্রামের অদূরে কুসুমডাঙার মেলা এই মোরগের লড়াইয়ের জন্য বিখ্যাত। মেলার পাঁচদিন সমানে চলে মোরগের লড়াই। দূর থেকে আদিবাসী মানুষেরা তাদের সেরা মোরগ নিয়ে আসে। মোরগের লড়াই এই অঞ্চলে প্রায় জাতীয় উৎসবের মতো।
বেলপাহাড়ির কেন্দ্রবিন্দু সড়কের পাশে ছোট এক বাজার। দু’ধারে মাটির ঘর। তারই মাঝে গোটা কয়েক পাকা বাড়ি। ষ্টেশনারী, মুদি আর কাঁচা আনাজের দোকান। জলখাবারের দোকানে ভোর সকালেই ব্যস্ততা। কাঁচা শালপাতার ঠোঙায় গরম তেলেভাজা আর মুড়ি। সকালের জলযোগ। ভিতরে ঢুকলে তীব্র ঝাঁঝালো আর মিষ্টি অন্য এক গন্ধও নাকে আসবে। মহুয়ার দেশি মদের খদ্দের জুটে গেছে এই ভোর সকালেই। হাতে হাতে কাঁচা শালপাতার ঠোঙায় সেই পানীয়। পেটে কয়েক ঢোঁক চালান দিয়ে শুরু হবে দিনের কাজ। শেষ বিকেলে ঘরে ফেরার পথে ফের আর এক প্রস্থ।
বাজারের পিছনে পুরনো দিনের নীলকুঠির ধ্বংসাবশেষ। নীল ভেজাবার জন্য তিন ধাপে ছয় সারিতে আঠারোটা ভাঙাচোরা চৌবাচ্চা সেই পুরনো দিনের সাক্ষ্য বহন করে টিকে আছে এখনও। বৃদ্ধ বনমালি সোরেনের কথায়, ‘ইখানে ত বাবু এক সময় জঙ্গল ছিল। ইয়ার পর সাহেবরা জঙ্গল সাফ করল। ক্ষেতি বানাইল। কুঠি হইল। শুরু হইল নীল চাষ। মোদের কপালটাও পুড়ল।’
সাহেবরা এখন আর নেই। নীলচাষও হয় না। তবে তাতে বনমালি সোরেনদের কপাল ফেরেনি। সাহেবরা বিদায় নিলেও ওদের সেই সবুজ অরণ্য আর ফিরে আসেনি। রয়ে গেছে সেই খেত। লালমাটির রুক্ষ এক ফসলি জমি। ওই বর্ষার সময় সামান্য ধান ছাড়া সেই মাটি বনমালিদের আর কিছু দিতে পারে না। বেলপাহাড়ির চারপাশে বিস্তীর্ণ প্রান্তরে সবুজের কোনও চিহ্ন আমার নজরে পড়েনি। সবে ফাল্গুন মাস। গোটা কয়েক পুকুরে শেষ তলানি লালচে খানিকটা জল টিকে আছে কোনওমতে। কদিন পরে এটুকুও থাকবে না।
বাজারে আনাজ বলতে শুকনো বাঁধাকপি, বেগুন, চালানি আলু আর মার্বেল সাইজের আধপাকা টম্যাটো। সকালের রোদ্দুরে পিঠ দিয়ে বৃদ্ধ বনমালি সোরেন বাজারের এক কোণে বাঁধাকপি পাতার গোটা কয়েক ছোট আঁটি সাজিয়ে বসে আছে। ঘন সবুজ রঙের বাতিল পাতা। কলকাতার বাজারে ছুঁড়ে ফেলা হয় ডাস্টবিনে।
‘এগুলো বিক্রি হয় এদিকে?’ অবাক হয়ে জিজ্ঞাসা করতে আরও অবাক হয়ে বৃদ্ধ মানুষটি বলল, ‘কেনে গো বাবু! খুব মিঠা ত!’

আমার সামনেই গোটা কয়েক আঁটি বিক্রি হয়ে গেল। নাহ্‌, নিজের দেশটার প্রায় কিছুই জেনে উঠতে পারিনি এখনও।

চেনা মাটি অচেনা মানুষ : বীজ


Wednesday, 7 January 2015

ফেসবুক থেকে নিবন্ধ (মোবাইল ভার্শন): খাম্বা বাবা

ফেসবুক থেকে: নিবন্ধ (মোবাইল ভার্শন)
খাম্বাবাবা
শিশির বিশ্বাস
হেলিওডোরস স্তম্ভ
ল্পটা অনেক দিনের পুরোনো মধ্যপ্রদেশের বিদিশা জেলায় ছোট এক জনপদ বেশনগর বিশেষজ্ঞদের অনুমান এখানেই ছিল সুপ্রাচীন বিদিশা নগরী স্থানটি বিশ্ববিখ্যাত সাঁচি স্তূপ থেকে মাত্রই পাঁচ মাইল দূরে পাশ দিয়ে বয়ে চলেছে বেশ নদী অদূরেই এক আশ্রম কয়েকজন সাধুর বাস আশ্রমের চত্বরে গাড় সিঁদুর লেপা একটি একশিলা স্তম্ভ লম্বায় সাড়ে ছয় মিটারের মতো স্থানীয় মানুষের কাছে স্তম্ভটি অতি জাগ্রত দেবতা খাম্বা বাবা প্রতিদিন পুজো হয় আর জ্যৈষ্ঠ আষাঢ় খাম্বা বাবার উৎসবের মাসে পূণ্যার্থী আসে দূরদূরান্ত থেকে সৌভাগ্য এবং পুত্র লাভের আশায় বলি পড়ে স্তম্ভের গায়ে তেলসিঁদুর চড়ানো হয় বিশ্বাস খাম্বা অর্থাৎ স্তম্ভ রূপধারী বাবা স্বয়ং মহাদেব তাঁর কৃপায় কোনও আশাই অপূর্ণ থাকে না
প্রবাদ বহুকাল আগে হীরাপুরী নামে এক সাধু এখানে বাস করতেন হঠাৎই একদিন তাঁর আশ্রমে অতিথি হয়ে এলেন জটাজুটধারী এক যোগীপুরুষ হীরাপুরী সেই যোগীপুরুষকে দেখেই চিনতে পারলেন। আগন্তুক আর কেউ নয় স্বয়ং মহাদেব তিনি সেই যোগীপুরুষকে তাঁর আশ্রমেই অবস্থান করতে অনুরোধ করলেন হীরাপুরীর সেবায় যোগীপুরুষ তুষ্ট হয়েছিলেন তিনি তাঁকে নিরাশ করলেন না খাম্বার রূপ ধরে আশ্রম প্রাঙ্গণে রয়ে গেলেন খাম্বা বাবার মাহাত্ম্য চারপাশে ছড়িয়ে পড়েতে এরপর আর দেরি হয়নি
চলছিল এই ভাবেই ১৮৭৭ সালের জানুয়ারি মাসে স্তম্ভটি নজরে আসে আলেকজান্ডার ক্যানিংহাম সাহেবের কোম্পানির শাসন অবসানের পরে তিনি তখন এদেশে আর্কিওলজিক্যাল দপ্তরের ডিরেক্টর জেনারেল হয়ে এসেছেন উৎসাহী মানুষটি প্রাচীন ভারতের প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনের খোঁজে চষে ফেলছেন সারা দেশ আশ্রমের চত্বরে যখন তিনি স্তম্ভটি দেখেন সর্বত্র তেলসিঁদুরের গাঢ় প্রলেপ অনেক কিছুই ঢাকা পড়ে গেছে তবু জহুরির চোখে জহরত চিনতে ভুল হয়নি স্তম্ভটি দেখার পরে তিনি তাঁর রিপোর্টে লিখছেন 'perhaps the most curious and novel discoveries that I have ever made'একশিলা স্তম্ভটির গঠনশৈলী পর্যালোচনা করে তিনি এটিকে গুপ্তযুগের বলে সনাক্ত করেছিলেন সুপ্রাচীন স্তম্ভের গায়ে কিছু লিপি থাকার যথেষ্ট সম্ভাবনা থাকে কিন্তু তেলসিঁদুরের পুরু আস্তরণ থাকায় ক্যানিংহাম সাহেব তেমন কিছু খুঁজে পাননি আশ্রমের অনুমতি না মেলায় রং তুলে ফেলাও সম্ভব হয়নি
হেলিওডোরাস স্তম্ভের নিম্নভাগে ব্রাহ্মী লিপি
অগত্যা অপেক্ষা করতে হল আরও তিরিশটি বছর ১৯০৯ সালে গোয়ালিয়র রাজ্যের সুপারিন্টেডিং ইঞ্জিনিয়ার মি. লেকের নির্দেশে স্তম্ভের গোড়ার দিকে কিছু অংশের সিঁদুর তুলে ফেলা হতে প্রথম লিপির সন্ধান পাওয়া গেল কিন্তু সবটা নয় লিপির অনেকটাই তখনো ইটপাথরে গাঁথা স্তম্ভের বেদীর তলায় রয়ে গেছে এর বেশি তখন আর এগোনো সম্ভব হয়নি বলা যায় প্রকৃত অনুসন্ধান শুরু হয় এর পাঁচ বছর পরে প্রত্নতাত্ত্বিক ড. ভাণ্ডারকারের তত্ত্বাবধানে পুরো দশ দিন লেগেছিল স্তম্ভের রং  পরিষ্কার করতে পুরোনো ভিত্তিপ্রস্তর ভেঙে ফেলে নতুন করে বসান হল স্তম্ভটিকে খ্রিপূ সময়ের ব্রাহ্মী হরফে লিখিত লিপিগুলি উদ্ধার হতে জানা গেল গুপ্তযুগ নয় স্তম্ভটি আরও কয়েকশো বছরের পুরোনো খ্রিপূ ১ম শতকের শুঙ্গ বংশীয় রাজা কাশীপুত্র ভগভদ্রর বিদিশার রাজসভায় তক্ষশীলার ইন্দো-গ্রীক রাজা অ্যান্টিয়ালকিডাসের দূত ছিলেন হেলিওডোরস গ্রীক রাজদূত হেলিওডোরস বিদিশায় বাসুদেব মন্দির প্রাঙ্গণে ভগবান বিষ্ণুর উদ্দেশ্যে এক গড়ুর স্তম্ভ স্থাপনা করেছিলেন খাম্বা বাবা সেই স্তম্ভ স্তম্ভলিপিতে হেলিওডোরস তাঁর আরাধ্য বাসুদেবকে দেবাদিদেব বলে স্তুতি করেছেন
কৌতূহলী পাঠকের জন্য প্রথম সাতটি লাইন বিবৃত করা যেতে পারে:
১) দেবদেবস বাসুদেবস গরুড়ধ্বজ অয়ং।
২) কারিতে ইয় হেলিওদোরেণ ভাগ।
৩) বতেন দিয়স পুত্রেণ তখসিলাকেন।
৪) যোন দূতেন আগতেন মহারাজাস।
৫) অন্তলিকিতস উপতা সকারু রজো।
৬) কাসী পুত্র ভাগভদ্রস ত্রাতারস।
৭) বসেন চতু দশেন রাজেন বধমানস।
অর্থাৎ দেবাদিদেব বাসুদেবের এই গড়ুরধ্বজা তক্ষশিলা নিবাসী ডিয়ন পুত্র ভাগবত অনুরাগী হেলিওডোরাস কর্তৃক স্থাপিত যিনি গ্রিক রাজা অ্যান্টিয়ালকিডাসের রাজদূত রূপে কাশীপুত্র ভগভদ্রের রাজত্বকালের চর্তুদশ বছরে তাঁর বিদিশার রাজ দরবারে আগমন করেন
মূল রহস্যের সমাধান হলেও প্রশ্ন রয়ে গেল বাসুদেবের সেই মন্দির কোথায় গেল সেটি? তবে কী স্তম্ভটি অন্য কোনও স্থান থেকে আনা হয়েছিল স্থানটি পর্যবেক্ষণের পরে অনুমান করা গিয়েছিল বর্তমান আশ্রমটি হয়তো সেই মন্দিরের স্থানেই নির্মিত ১৯৬৩৬৫ সালে প্রত্নতাত্ত্বিক এম.ডি খারে সেই আশ্রম-বাড়িটি ভেঙে সরিয়ে দিয়ে খনন কাজ শুরু করতেই বের হয়ে পড়ল খ্রিপূ ৩য় শতকে নির্মিত উপবৃত্তাকার বিশাল এক মন্দিরের ভিত এযাবত কাল জ্ঞাত এইটিই ভগবান বাসুদেবের প্রাচীনতম মন্দির         
                                       

তক্ষশীলার গ্রিক রাজা অ্যান্টিয়ালকিডাসের রৌপ্যমুদ্রা

মন্দিরের গর্ভগৃহের ক্ষেত্রফল ছিল ৮.১৩ বর্গ মিটার প্রদক্ষিণ পথ আড়াই মিটার চওড়া এছাড়া বড় আকারের সভামণ্ডপ তথা দর্শন গৃহ  পাওয়া গেছে সভামণ্ডপের এক কাঠের দরজার অস্তিত্ব শুধু বর্তমান স্তম্ভটি নয় মন্দিরের পুব দিকে উত্তরদক্ষিণ বরাবর আরও সাতটি স্তম্ভ ছিল হেলিওডোরাস স্তম্ভটি অষ্টম বিভিন্ন সময়ে ভক্তবৃন্দ মঙ্গল কামনায় এগুলি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন কিন্তু বর্তমান স্তম্ভটি ছাড়া আর কোনটিরই সন্ধান মেলেনি
অনুমান করা যায় বাসুদেবের মন্দিরের প্রাঙ্গণে হেলিওডোরসের স্তম্ভ সহ যে আটটি স্তম্ভ ছিল কালের প্রভাব এবং পরবর্তীকালে কালাপাহাড়ি তাণ্ডবে মন্দিরের সঙ্গে সেগুলিও ভূলুণ্ঠিত হয়েছিল বর্তমান হেলিওডোরস স্তম্ভটিও অর্ধ ভগ্ন স্তম্ভ শীর্ষের গড়ুর মূর্তিটি বিনষ্ট হয়ে গেছে সন্দেহ নেই ভগ্ন মন্দির প্রাঙ্গনে ভগ্ন অর্ধভগ্ন স্তম্ভগুলি হেলায় পড়ে ছিল পাথরগুলি যে যার মতো তুলে নিয়ে কাজে লাগিয়েছে এইভাবেই এই সেদিন ১৭৯৪ সালে কাশীর রাজা চৈত সিংয়ের দেওয়ান জগত সিং সম্রাট অশোক নির্মিত সারনাথের বিখ্যাত ধর্মরাজিকা স্তূপ থেকে ইটপাথর নিয়ে নিজের কাজে লাগিয়েছিলেন বিখ্যাত স্তূপটি ওই সময় পর্যন্ত মোটামুটি ভাল অবস্থাতেই ছিল আজ এই স্তূপের ভিত্তিটুকু ছাড়া আর কিছুই প্রায় অবশিষ্ট নেই
যাই হোক সম্ভবত ওই সময় আশ্রমের সাধু হীরাপুরী অনাদরে পড়ে থাকা একটি স্তম্ভকে শিবজ্ঞানে ফের স্থাপনা করে পূজা শুরু করায় রক্ষা পেয়ে গেছে হেলিওডোরাস স্তম্ভটি হারিয়ে যাওয়া ইতিহাসের অন্তত একটি ছেঁড়া পাতা উদ্ধার করা গেছে অঞ্চলটিতে ব্যাপক অনুসন্ধান হলে ভগ্ন দুএকটি স্তম্ভও হয়তো খুঁজে পাওয়া সম্ভব কিন্তু তা আর হয়নি এ দেশের হারিয়ে যাওয়া ইতিহাসের আরও কয়েকটি পাতা চাপা পড়ে রয়েছে ওই অঞ্চলের মাটির তলায় হয়তো কোনও দিন উদ্ধার করা যাবে
স্থানটির কিছু পূর্ব দিকে খ্রিপূ ৩য় শতকে নির্মিত একটি বৌদ্ধ স্তূপের ধ্বংসাবশেষ পাওয়া গেছে স্তূপটি সাঁচি স্তূপের পূর্ববর্তী
প্রসঙ্গত আর একটি কথা বলতেই হয় হেলিওডোরসের এই গড়ুর স্তম্ভটির কল্যাণে বাংলা সাহিত্যে সংযোজিত হয়েছে একটি অনন্যসাধারণ ঐতিহাসিক গল্প বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায় এই স্তম্ভটিকে নিয়েই লিখেছেন তাঁর বিখ্যাত স্বপ্ন-বাসুদেবগল্পটি বিষয়টি তাঁকে এতটাই অনুপ্রাণিত করেছিল যে তৃপ্ত না হওয়া পর্যন্ত গল্পটি তিনি বার কয়েক ফিরে লিখেছিলেন প্রায় দুই হাজার বছর আগে সেদিনের বিদিশা নগরী তথা আজকের বেশনগরের এক চমৎকার ছবি আঁকা আছে এই গল্পে

আলোকচিত্র: বিভিন্ন ওয়েবসাইটের সৌজন্যে।
১৬/১২/২০১৫